আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা source । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর internet ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে internet এ লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা internet এ কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ helpful হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি Statistics এর ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, April 16, 2017

বারকুল (চিল্কা) ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ


বৃহস্পতিবার ১৩ই এপ্রিল, ২০১৭ঃ হাওড়া - রাত ১১ঃ৩০ মিনিটে অমরাবতী এক্সপ্রেস
শুক্রবার ১৪ই এপ্রিল, ২০১৭ঃ সকাল ৬ঃ১০ মিনিট - ভুবনেশ্বর - সকাল ৭ঃ১০ মিনিটের ভুবনেশ্বর-ভিশাখাপত্তনম ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস - সকাল ৯ টা - বালুগাঁও - বারকুল । বারকুল - গোপালপুর - বারকুল । বারকুলে রাত্রিবাস ।
শনিবার ১৫ই এপ্রিল, ২০১৭ঃ বারকুলে জলপথে ভ্রমণ - বারকুলে রাত্রিবাস ।
রবিবার ১৬ই এপ্রিল, ২০১৭ঃ বারকুল - বালুগাঁও - সকাল ৮ঃ৪৯ মিনিটের ফলকনামা এক্সপ্রেস - বিকেল ৬ঃ২০ মিনিট - হাওড়া

ভারতবর্ষের ম্যাপ আঁকার সময়ে উড়িষ্যার এক জায়গায় একটা ছোট্ট জলাশয়ের খাঁজ দিতে হয়, মনে আছে ? (এটা না দিলে ভুল হয় না, তবে দিলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা বেশি পছন্দ করেন ।) জায়গাটার নাম চিল্কা । ভারতবর্ষের বৃহত্তম আর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম উপহ্রদ । লেকটা সুবিশাল, তার মধ্যে দু'টো জায়গায় দু'টো ট্যুরিস্ট স্পট আছে - রম্ভা আর বারকুল । এদের মধ্যে বারকুলে ১৪২৩ আর ১৪২৪ বাংলা বছরের সন্ধিক্ষণে সপ্তাহান্তে  দু'দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা আমার ব্লগের এবারের বিষয় ।

ট্রেনে বালুগাঁও যাওয়ার পথে
আমাদের এবারের দল রাজগীর-এর অপরিবর্তিত দল । বারকুল যাওয়ার জন্য বালুগাঁওতে নামতে হয় আর হাওড়া থেকে বালুগাঁও যাওয়ার জন্য একাধিক ট্রেন রয়েছে । সবথেকে ভালো ট্রেন হল চেন্নাই মেল কিন্তু টিকিট না পাওয়ার জন্য আমরা ব্রেকজার্নি করতে বাধ্য হলাম । ১৩ই এপ্রিল, ২০১৭ বৃহস্পতিবার রাত ১১ঃ৩০ মিনিটের অমরাবতী এক্সপ্রেস ধরে আমরা পরেরদিন সকাল ৬ঃ১০ মিনিটে ভুবনেশ্বর নামলাম । সেখান থেকে সকাল ৭ঃ১০ মিনিটের ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরে সকাল ৯ টায় বালুগাঁও । এই ভুবনেশ্বর থেকে বালুগাঁও যাওয়ার সময়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য খুব সুন্দর । মাঝে মাঝেই ছোট ছোট পাহাড় - সেগুলোকে পাহাড় না বলে টিলা বলাই ভাল । এর মাঝখান দিয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে । এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি হওয়া সত্ত্বেও গরম সেরকম লাগছিল না, একটা আরামদায়ক হাওয়া সারাক্ষণই পাওয়া যাচ্ছিল ।

বালুগাঁও স্টেশন থেকে বারকুল যাওয়ার জন্য চাইলে ও টি ডি সি (ওড়িশা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) থেকে গাড়ি বুক করে রাখা যায় । সেটা না করতে চাইলে শুধুমাত্র অটোই ভরসা । স্টেশন থেকে বারকুলের দূরত্ব ৭ কিলোমিটার মতো আর অটোয় যেতে মিনিট কুড়ির বেশি লাগে না । আমরা দু'টো অটো ধরে পৌঁছে গেলাম বারকুল পান্থনিবাসে ।

ব্যালকনি থেকে চিল্কা
এর আগে চাঁদিপুরে আমরা ও টি ডি সি-তে ছিলাম আর এবারে বারকুলে । জায়গাটা একটা বিশাল চত্বর আর তার মাঝে মাঝে কয়েকটা দোতলা বিল্ডিং । ট্যুরিজমের ব্যাপারে উড়িষ্যা সরকার বিশেষ যত্নবান এটা আগেও দেখেছি - এই রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তিই হল ট্যুরিজম । একটা বিল্ডিং-এর দোতলায় পাশাপাশি তিনটে ঘরে আমরা আর কঙ্কনাদিরা থাকলাম । কিছুটা দূরে একটা এ সি কটেজে সমীরণদারা । আমাদের ঘরগুলো সবই লেকের সামনে - প্রত্যেকটা ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া ব্যালকনি আছে যেখানে বসে লেকের দৃশ্য উপভোগ করা যায় (দাঁড়িয়েও করা যায়, যেহেতু উপভোগের সঙ্গে আরামের সরাসরি সম্পর্ক আছে তাই বসলে বেশী ভালো লাগে !) । আমরা ঘরে ঢুকে একটু হাতমুখ ধুয়ে চলে গেলাম ডাইনিং হলে ।

চত্বরের মধ্যেই একটা সুবিশাল ডাইনিং হল । ভেতরটা এ সি । এখানে একসঙ্গে অন্ততঃ ৫০ - ৬০ জন বসে খেতে পারে । এখানে ঘরের চার্জের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি, যদিও প্রথমদিনের ব্রেকফাস্টটা আমরা কমপ্লিমেন্টারি নিলাম না, সেটা আমরা রেখে দিলাম ফেরার দিনের জন্য ।
(অঙ্কটা বোঝা যাচ্ছে না ? বুঝিয়ে দিচ্ছি । আমরা থাকছি দু'দিন । সেই হিসেবে আমাদের দু'টো ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি হয় । আমরা প্রথমদিন নিলাম না, দ্বিতীয়দিন একটা আর তৃতীয়দিন সকালে আমরা যখন চেক্‌আউট করব, তখন আরেকটা নিয়ে নেব ।)
ব্রেকফাস্টে আমরা পাঁউরুটি-ডিমসেদ্ধ-কলা আর পুরী-সবজি নিলাম । এখানকার রান্না বেশ ভালো আর খিদেও পেয়েছিল, তাই গপাগপ খেয়ে ফেললাম !

পান্থনিবাসের ভেতরে
ঘরে ফিরে এসে চানটান করে নিলাম । এখানে ঘরে বসে এমনিই সময় কেটে যায় আর আমাদের সঙ্গে ছোটো বাচ্চা থাকায় আমাদের সময় কাটানোর কোনও সমস্যা হয় না (সত্যি বলতে কি, আমাদের মাঝে মাঝে সময়ের অভাবই হয় !) । দুপুরে দু'টো নাগাদ খেতে গেলাম । এখানে একধরনের মাছ পাওয়া যায় - নাম খাইঙ্গা । এটা এই অঞ্চলেরই মাছ, এখানেই লেক থেকে জেলেরা ধরে । একপ্লেটের দাম একপ্লেট পোনা মাছের দ্বিগুণ । আমরা একপ্লেট নিলাম টেস্ট করার জন্য । খেতে অনেকটা ভেটকি মাঝের মতো, তবে ভেটকির মতো অত সুস্বাদু নয় । ভাত, ডাল, আলুভাজা, মাছ আর চিংড়ি নিয়ে আমাদের ন'জনের মোট খরচ পড়ল ২,১৪৫/- টাকা ।

গোপালপুর যাওয়ার পথে
দুপুরে ঘরে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম । বিকেল ৪ টের সময়ে একটা বোলেরো নিয়ে বেরিয়ে পড়া হল গোপালপুরের উদ্দেশ্যে । একটা বোলেরোতে ন'জন ধরা আক্ষরিক অর্থেই 'বেশ চাপের' কিন্ত কথায় বলে "যদি হও সুজন/বোলেরোতে ন'জন" - তাই কষ্টেসৃষ্টে আমরা বসে পড়লাম । বারকুল থেকে গোপালপুরের দুরত্ব ৭৫ কিলোমিটার হলেও যেতে ঘন্টা দেড়েকের বেশি লাগল না তার প্রধান কারণ হল রাস্তাটা দুর্দান্ত । একেবারে মাখনের মতো সুন্দর রাস্তা তাই গাড়িতে বসে বোঝাই যাচ্ছিল না যে মাঝে মাঝে গাড়ির গতি ঘন্টায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে । রাস্তার দৃশ্যও খুব সুন্দর - একজায়গায় রাস্তাটা একটা পাহাড়ের গা দিয়ে কিছুটা গেছে । সেখান থেকে চিল্কা লেকের দৃশ্য খুব সুন্দর । এখানে আমরা মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে ছবিটবি তুললাম ।

গোপালপুর সি-বিচ্‌
গোপালপুর মানে 'গোপালপুর অন্‌ সি' (কেন যে গোপালপুরকে 'গোপালপুর অন্‌ সি' বলা হয় আমি কখনও বুঝিনি । সমুদ্রের ধারের যেকোনও জায়গাই তো অন্‌ সি । কিন্তু পুরী অন্‌ সি বা দীঘা অন্‌ সি কখনও বলা হয় না, শুধুমাত্র গোপালপুরই অন্‌ সি ।) । গোপালপুরের বিচটা খুব সুন্দর । আমরা যখন পৌঁছেছি, তখন সবেমাত্র সূর্য্যাস্ত হয়েছে । আকাশ আর সমুদ্রের মধ্যে চলেছে রঙের আদানপ্রদান । আবহাওয়া খুবই আরামদায়ক - একটা সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল । গরম একেবারেই লাগছিল না । আমরা কিছুক্ষণ জলে পা-টা দিয়ে পাড়ে এসে বসলাম । বাঁধানো পাড়ে সুন্দর বসার জায়গা করা আছে । এখানে বসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় । আমরা অবশ্য অতঘন্টা বসিনি, কিছুক্ষণ বসার পরে ওখান থেকে উঠে এসে একটা দোকান থেকে চিকেন পকোড়া খেয়ে নেওয়া হল । খরচ হল ৩০০/- টাকা ।

৭ টা নাগাদ আমরা ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার জন্য সময় বেশি লাগল কারণ রাত্রিবেলা অত জোরে গাড়ি চালানো যায় না, চালানো উচিৎও নয় । বারকুল পান্থনিবাসে পৌঁছতে আমাদের প্রায় ন'টা বেজে গেল । গোপালপুর যাতায়াতের জন্য গাড়ি নিল ২,৫০০/- টাকা । দশটা নাগাদ আমরা ডাইনিং হলে গেলাম । রাতের মেনু ছিল রুটি আর চিকেন কারি । খরচ হল ১,১৯৭/- টাকা ।

লেকের ওপরে সূর্য্যোদয়
১৫ই এপ্রিল, ২০১৭ শনিবার - বাংলা নববর্ষ । সকালে যখন উঠলাম তখন সবে সূর্য্যোদয় হয়েছে । আমাদের ঘরগুলো থেকে খুব সুন্দর সূর্য্যোদয় দেখা যায় । একেবারে লেকের জলের ওপর থেকে সূর্য্য ওঠে । কিছুক্ষণ পরে আমরা ডাইনিং রুমে গেলাম ব্রেকফাস্ট করতে । মেনু আগের দিনের মতোই - এখানে এই মেনুই প্রতিদিন হয় । ব্রেকফাস্ট করে সকাল ৯ টার সময়ে আমরা বেরোলাম জলবিহারে । ও টি ডি সি থেকে বোটে করে বিভিন্ন দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে । সেরকমই একটা বোট আমরা ভাড়া করেছিলাম । বোটে ২০ জনের বসার জায়গা আছে । মাথাটা পুরোটাই ছাউনি দেওয়া । বোটে চড়ার জন্য ও টি ডি সি-র নিজস্ব জেটির মতো আছে । সেখান থেকে বোটে চড়ে আমরা রওনা দিলাম 'কালিজাই দ্বীপ'-এর দিকে । চিল্কায় একটা জায়গা আছে যেখানে গেলে ডলফিন দেখতে পাওয়া যায় (মানে গেলে দেখতে পাওয়া যাবেই এরকম কোনও কথা নেই - অনেকটা সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ দেখতে পাওয়ার মতো । না, ভুল লিখলাম । হয়তো এতটা অনিশ্চিতও নয় ।) । কিন্তু আমরা গেলাম না কারণ এখন গ্রীষ্মকাল আর এই সময়ে নাকি ডলফিন সেভাবে দেখা যায় না ।

আমাদের বোটে আমরা সবাই
আমাদের এই জলপথে ভ্রমণটা খুবই সুন্দর । চিল্কার সঙ্গে সমুদ্রের যোগাযোগ আছে আর যেহেতু এর পরিসর সুবিশাল তাই এখানে ঢেউও আছে । তারই মধ্যে আমাদের বোট এগিয়ে চলল । রোদের তেজ বেশ বেশি হলেও জলের মধ্যে সেরকম গরম লাগে না - একটা ঠান্ডা হাওয়া বইতে থাকে । আমাদের এই জলপথে ভ্রমণটা আমাদের মহারাষ্ট্র ভ্রমণ-এর মতো - যেদিন আমরা লঞ্চে করে মুম্বই থেকে এলিফ্যান্টা গেছিলাম ।  পার্থক্য হল সেদিন লঞ্চে আমাদের দল ছাড়াও আরও লোক ছিল আর এবারে শুধু আমরাই ।

কালিজাই মন্দিরের সামনে
প্রায় ৪৫ মিনিট চলার পর আমরা পৌঁছলাম কালিজাই দ্বীপ-এ । এখানে একটা কালিজাই দেবীর মন্দির আছে । দ্বীপটা সবমিলিয়ে খুব একটা বড় না, পুরোটা হেঁটে ঘুরতে বড়জোর ঘন্টাখানেক লাগে । আর সত্যি কথা বলতে কি ঘুরে দেখার মতো সেরকম কিছু নেইও । দ্বীপের মধ্যে একটা ছোট্ট টিলা আছে আর এর ওপরে একটা ছাউনি দেওয়া জায়গা । আমরা সেই ছাউনিটার ওপরে উঠলাম । এটাই দ্বীপের সর্ব্বোচ্চ জায়গা । এখান থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় । সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে নেমে এসে আমাদের মধ্যে কয়েকজন গেলাম দ্বীপটাকে একটা চক্কর দিতে । কিছুদূর গিয়েই বুঝতে পারলাম দেখার কিছুই নেই, ঝোপঝাড় গাছপালার মধ্যে একটা সিমেন্টের বাঁধানো পায়ে চলা পথ । সেটা দিয়ে দ্বীপের কিছুটা ঘুরে আমরা যেখানে বোট থেকে নেমেছিলাম, সেখানে ফিরে এলাম । ঘড়ি বলছে বেলা সাড়ে দশটা, আর তাই আমরা এবার ফেরার জন্য বোটে উঠে পড়লাম (না, আমরা কালিজাই মন্দিরে ঢুকিনি, পুজো দেবারও কোনও প্রশ্ন ওঠে না) ।

ফেরাটাও একই রকম তাই সেটার সম্পর্কে আর বিস্তারিত লিখছি না । ফেরার সময়েও একই সময় লাগল । বোট থেকে নেমে যখন পান্থনিবাসের দিকে যাচ্ছি, তখন গরমটা টের পাওয়া যাচ্ছিল । এখানে জানিয়ে রাখি চিল্কা হ্রদ হিসেবে সুবিশাল হলেও আদপে এটা একটা হ্রদই, তাই সমুদ্রের মতো সবসময়ে এখানে হাওয়া দেবে এরকম আশা করা ঠিক নয় । বিশেষ করে মাঝে মাঝে বেশ গুমোটই লাগে । তবে জলের ধারে জায়গা, তাই বাতাসে আর্দ্রতা বেশি, তাই গরমে গা পুড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নেই ।

ঘরে ফিরে এসে আবার সেই 'কিছু করার নেই' অর্থাৎ অনেক কিছু করার আছে । দুপুরে খেতে গেলাম দু'টো নাগাদ । মেনু প্রায় একই, তবে মাছের বদলে বেশ কয়েক প্লেট চিকেন নেওয়া হল বলে খরচ কিছুটা কম পড়ল - ১,৪১০/- টাকা । ঘরে ফিরে এসে কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে আড্ডা মারলাম ।

ও টি ডি সি-র নিজস্ব ঘেরা জায়গায়
বিকেলে আমাদের আর আলাদা করে কোথাও যাওয়ার ছিল না, তাই পান্থনিবাসের সামনেই ও টি ডি সি-র যে জেটিটা আছে, সেখানে গেলাম । এখানে লেকের কিছুটা জায়গা ও টি ডি সি ঘিরে রেখেছে, সেই ঘেরা জায়গার পাঁচিলের ওপর দিয়ে চাইলে হেঁটে ঘোরা যায় । এখানে নির্দিষ্ট দূরে কয়েকটা বসার জায়গাও রয়েছে । আমরা যখন সেখানে গেলাম, তখন সবেমাত্র সূর্য্যাস্ত হয়েছে, পেছনের পাহাড়ের ওপর সেই দৃশ্য দেখতে ভারী সুন্দর লাগছিল । জায়গাটায় পর্য্যাপ্ত আলো আছে, তাই সন্ধ্যে পেরিয়ে গেলেও কোনও অসুবিধে নেই । আর সবথেকে বড় কথা জায়গাটা ও টি ডি সি-র এলাকার মধ্যে, তাই নিরাপত্তা নিয়েও কোনও সমস্যা নেই ।

এখান থেকে ফিরে এসে আমরা বেরোলাম পান্থনিবাসের বাইরে । কিছু দেখার নেই, তবে একটা বড় দলে সবাই মিলে একসঙ্গে হেঁটে ঘোরাঘুরি করতেও ভালোই লাগে, আর আমরা মাঝে মাঝে সেটাই করে থাকি । পান্থনিবাসের বাউন্ডারির বাইরেই কিছু দোকান আছে, সেখান বসে আমরা বাঁধাকপির পকোড়া, বড়া ইত্যাদি খেলাম । বাঁধাকপির পকোড়াটা বেশ নতুন ধরনের, খেয়ে একেবারেই বোঝা যায় না যে বাঁধাকপি দিয়ে তৈরি । এই দোকানেই আমাদের ডিনার অর্ডার দিয়ে ঘরে ফিরে এলাম । রাত ন'টা নাগাদ গিয়ে ডিনার নিয়ে আসা হল । বলা বাহুল্য, খরচ অনেক কম পড়ল । রুটি আর চিকেন নিয়ে খরচ হল ৮৯৯/- টাকা ।

১৬ই এপ্রিল, ২০১৭ - রবিবার সকালে ঘুম ভাঙল আগেরদিনের থেকেও আগে - তখনও অন্ধকার কাটেনি । এই অবস্থা থেকে আলো ফুটে সূর্য্যোদয় যতক্ষণে হয়, সেই পুরো সময়টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ভাল লাগে । আগেই বলেছি, এখানে জলের ওপর থেকে সূর্য্যোদয় দেখা যায় । বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করলাম ।

আমাদের ঘর
সকাল ৮ টা নাগাদ আমরা পান্থনিবাস থেকে চেক্‌আউট করে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের প্রাপ্য ব্রেকফাস্টটা আমরা প্যাক করে নিয়ে নিলাম । আমাদের ফেরার ট্রেন ফলকনামা এক্সপ্রেস বালুগাঁও থেকে সকাল ৮ঃ৪৯ মিনিটে । স্টেশনে আসতে মিনিট কুড়ির বেশি লাগে না । স্টেশনে এসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেই ট্রেন এসে গেল । ফলকনামা একেবারে হাওড়া পর্যন্ত্য যায়, তাই ফেরার সময়ে আমাদের আর ব্রেকজার্নি করতে হবে না । আমাদের সঙ্গে কোনও লাঞ্চের ব্যবস্থা ছিল না, ট্রেনের প্যান্ট্রির খাবারই ভরসা । দুপুরে চিকেনভাত আর নিরামিষ ভাত নিয়ে ভাগাভাগি করে খাওয়া হল ।

ফলকনামার হাওড়া পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় বিকেল ৫ঃ৪৫ মিনিট আর মাত্র আধঘন্টা দেরীতে আমরা পৌঁছে গেলাম । তারপর ট্যাক্সিতে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে ৯ ঘন্টার ট্রেনের দূরত্বে উড়িষ্যায় চিল্কা হ্রদ একটা বিখ্যাত বেড়ানোর জায়গা । চিল্কায় থাকার জায়গা মূলতঃ দু'টো - বারকুল আর রম্ভা ।
২. বারকুল আর রম্ভা দু'টো জায়গাতেই ও টি ডি সি-র পান্থনিবাস আছে । এদের ওয়েবসাইট https://visitodisha.org/Search-Hotel-List থেকে বুকিং করা যায় অথবা এদের কলকাতার অফিস 'উৎকল ভবন' থেকেও বুকিং করা যায় । উৎকল ভবনের ফোন নম্বর হল - (033)22493653.
৩. শুধুমাত্র বারকুল নয়, ও টি ডি সি-র যেকোনও পান্থনিবাসে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ১০% ছাড় আছে । যদি দলে কোনও প্রবীণ নাগরিক থাকেন তাহলে তাঁর নামে বুকিং করার সময়ে সেটা মাথায় রাখলে ভাল ।
৪. বারকুল পান্থনিবাসের চেক-আউটের সময় হল সকাল ৮ টা অর্থাৎ এদের সময়সীমা ৮ টা থেকে ৮ টা ।
৫. পান্থনিবাসের ঘরগুলো সবই লেকের দিকের । ঘরের ব্যালকনি থেকে লেকের দৃশ্য উপভোগ করা যায় ।
৬. প্রত্যেক ঘরের সঙ্গেই কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট রয়েছে । এখানে খাবারের মান বেশ ভালো । এখানে একটা আলাদা ডাইনিং রুম আছে আবার চাইলে ঘরে আনিয়েও খাবার খাওয়া যেতে পারে ।
৭. এখানে বেড়ানোর জায়গা বলতে চিল্কা লেক । লেকে বোটিং করার ব্যবস্থা আছে, আর বোটে করে এখান থেকে কাছাকাছি কালিজাই দ্বীপে যাওয়া যায় ।
৮. বারকুল থেকে কালিজাই দ্বীপ বোটে যেতে ৪০ - ৪৫ মিনিট লাগে । এই দ্বীপে মুলতঃ একটা কালিমন্দির আছে । দ্বীপটা খুব একটা বড় নয়, পুরোটা হেঁটে ঘুরতে ঘন্টাখানেকের বেশি লাগার কথা নয় ।
৯. এখানে একটা জায়গা আছে যেখান থেকে ডলফিন দেখতে পাওয়া যায় । তবে গরমকালে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে আমরা আর এখানে যাইনি ।
১০. বারকুল থেকে চাইলে গোপালপুর যাওয়া যেতে পারে - দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার । গোপালপুরের আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য নেই - শুধুমাত্র একটা সী-বিচ্‌ ।
১১. গোপালপুর যাতায়াতের রাস্তাটা খুব সুন্দর । কিছুটা রাস্তা পাহাড়ের ওপর দিয়ে আর সেখান থেকে লেকের দৃশ্য দেখতে খুবই ভালো লাগে ।
১২. বছরের যেকোনও সময়েই বারকুল যাওয়া যেতে পারে । জলের ধারে হওয়ায় এখানকার তাপমাত্রায় বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায় না ।

উপসংহারঃ

চিল্কা
প্রধানতঃ সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনশিল্পভিত্তিক রাজ্য উড়িষ্যার একটা অন্যতম পর্যটনের জায়গা হল চিল্কা - যেটা সমুদ্রভিত্তিক নয় । আর চিল্কার এক দিকে বারকুলে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে । এখানে সমুদ্রের গর্জন নেই, রয়েছে লেকের নিস্তব্ধতা । এখানে জলের উচ্ছাস নেই, রয়েছে স্নিগ্ধতা । এখানকার জলে স্নান করা যায় না, শুধুই দেখে উপভোগ করত হয় । আর এগুলোই চিল্কার ইউ এস পি । এখানে কাছাকাছির মধ্যে দেখার আর কিছুই নেই কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না । আমাদের মতো যারা বেড়াতে গিয়ে 'ক'টা জায়গা দেখা হল' আঙুলের গাঁট গুণে সেই হিসেব করে না, তাদের জন্য চিল্কা একটা আকর্ষণীয় জায়গা । শান্ত, নিরিবিলি জায়গায় প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য চিল্কা । দৈনন্দিন একঘেয়ে রুটিনের বাইরে বেরিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জন্য চিল্কা । কম পুঁজি আর দিনতিনেকের ছুটি সম্বল করে বেড়ানোর মতো জায়গা হল চিল্কা । চিল্কা এমন একটা জায়গা যেখানে বারবার গেলেও একঘেয়ে লাগবে না । আর যারা কখনও যায়নি, তাদের ভালো লাগতে বাধ্য । এই ভালো লাগাটা অনুভব করার জন্য একবার ঘুরে আসতেই হবে - চিল্কা !

বারকুল ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, January 1, 2017

রাজগীর ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

বুধবার ২৮শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ হাওড়া - রাত ৮ঃ৩৫ মিনিটে দানাপুর এক্সপ্রেস
বৃহস্পতিবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ সকাল ৭ঃ৪৫ মিনিট - বখ্‌তিয়ারপুর - সকাল ১০ টায় প্যাসেঞ্জার ট্রেন - দুপুর ১২ টা - রাজগীর । রাজগীরে রাত্রিবাস ।
শুক্রবার ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ রাজগীর - নালন্দা - রাজগীরে রাত্রিবাস ।
শনিবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ রাজগীরে লোক্যাল সাইট সিয়িং - গাড়িতে বখ্‌তিয়ারপুর - রাত ১০ঃ০৯ মিনিটে রাজেন্দ্রনগর হাওড়া এক্সপ্রেস
রবিবার ১লা জানুয়ারী, ২০১৭ঃ সকাল ১০ টা - হাওড়া

মাধ্যমিকে যখন ইতিহাস পড়েছি, তখন বইয়ের প্রথমদিকে যেসব সাম্রাজ্য বা রাজবংশের কথা লেখা থাকত তার বেশিরভাগগুলোরই সময়কাল BC অর্থাৎ যীশুখৃষ্টের জন্মের আগেকার । এইসময়কার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের কিছু আমাদের চারপাশে এখনও দেখা যায় - এখনও ভারতবর্ষে এরকম অনেক জায়গা রয়েছে যেগুলো সেইসময়কার ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে । সেইরকমই একটা আদ্যন্ত ঐতিহাসিক জায়গা হল - বিহারের 'রাজগীর' । রাজগীর শব্দটা আসলে 'রাজগৃহ' শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ রাজার গৃহ । ইতিহাসের বিভিন্ন রাজারা এখানে বিভিন্ন সময়ে রাজধানী স্থাপন করেছেন । মৌর্য্য বংশ, সম্রাট অশোক, হর্যঙ্ক বংশ, বিম্বিসার, অজাতশত্রু ইতিহাসের এইসব নাম এই রাজগীরের সঙ্গে যুক্ত । গত ইংরিজী বছরের শেষ ক'টা দিন এখানে ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতাই আমার এবারের লেখার বিষয়বস্তু ।

আমরা প্রত্যেকবারই যেখানে বেড়াতে যাই, আগে থেকে সেই জায়গাটার সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, এটা আগেও বলেছি । কিন্তু রাজগীরের ক্ষেত্রে সেটা করতে গিয়ে যে বিশেষ অসুবিধের মধ্যে পড়তে হয়েছে সেটা হল ইন্টারনেটে রাজগীর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না । তার মানে এই নয় যে এখানে লোকজন বেড়াতে যায় না, তবে ট্যুরিজমের ব্যাপারে বিহার যে ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যের থেকে এখনও অনেকটা পিছিয়ে আছে, সেটা বলতেই হবে । হোটেল বুকিং-এর ক্ষেত্রেও আমাদের বিস্তর খোঁজাখুঁজি করতে হয়েছে আর শেষ পর্যন্ত আমরা যা পেয়েছিলাম ... থাক সেটার ব্যাপারে বিস্তারিত যথাসময়ে লিখব । আপাতত বেড়ানো শুরু করা যাক !

এবারে আমাদের দল তিনজন শিশুসমেত বারোজনের । কে কে ছিল সেটা আর আলাদা করে লিখছি না, এটা আমাদের দেওঘর ভ্রমণের অপরিবর্তিত দল । ২৮শে ডিসেম্বর, ২০১৬ বুধবার হাওড়া স্টেশন থেকে রাত ৮ঃ৩৫ মিনিটে দানাপুর এক্সপ্রেসে আমরা রওনা দিলাম । রাজগীরে স্টেশন থাকলেও এটা মেইন লাইনের মধ্যে পড়ে না, অনেকটা দেওঘরের মতোই । দেওঘর যেতে গেলে যেমন জসিডি-তে নেমে ট্রেন বা গাড়ি করে যাওয়া যায়, সেরকমই রাজগীর যেতে গেলে নামতে হয় বখ্তি‌য়ারপুরে (এটা শুনেই বখ্তি‌য়ার খিলজীর কথা মনে পড়ছে তো ? সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবেই জিজ্ঞেস করছি, ওনার
বখ্‌তিয়ারপুর স্টেশনে কুয়াশা
পুরো নাম মনে আছে ? যাদের মনে নেই তাদের জন্য উত্তরটা হল 'ইখতিয়ার-উদ্দীন মহম্মদ বিন বখ্তি‌য়ার খিলজী') । তবে দেওঘরের সঙ্গে পার্থক্য হল বখ্‌তিয়ারপুর থেকে রাজগীর পৌঁছতে দু'ঘন্টা সময় লাগে । দানাপুর এক্সপ্রেসের বখ্তি‌য়ারপুর পৌঁছনোর কথা ভোর ৪ঃ৫৩ মিনিটে । আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম বখ্‌তিয়ারপুর থেকে সকাল ৬ঃ১০ এর প্যাসেঞ্জার ট্রেনে রাজগীর যাব । কিন্তু কুয়াশার জন্য দানাপুর এক্সপ্রেস প্রায় তিনঘন্টা লেট করে বখ্‌তিয়ারপুর পৌঁছল । স্বভাবতই আমাদের প্যাসেঞ্জার ট্রেন আর ধরা হল না এবং আমরা পরের ট্রেন ধরলাম । এই পরের ট্রেনটা সকাল ৮ঃ০৫ - এ বখ্‌তিয়ারপুর থেকে ছাড়ার কথা হলেও সেটা ছাড়ল প্রায় ১০ টা । যাইহোক, নানারকম বিভ্রাটের মধ্যে দিয়ে আমরা রাজগীর পৌঁছলাম দুপুর বারোটা ।

রাজগীর স্টেশন থেকে আমাদের হোটেলের দূরত্ব খুব বেশি না, আমরা একটা টাঙ্গা আর দু'টো রিক্সা করে পৌঁছে গেলাম 'হোটেল মমতা'-য় । হোটেলটার সম্পর্কে খুব বিস্তারিত লিখছি না তবে এটা বলতে পারি আমরা আজ পর্যন্ত্য বেড়াতে গিয়ে যত হোটেলে থেকেছি, হোটেল মমতা তার সবথেকে খারাপগুলোর একটা । আমাদের যেরকম ঘর দেওয়ার কথা ছিল, যে তলায় দেওয়ার কথা ছিল, সেসব তো এরা কিছু দিতে পারলই না, উপরন্তু হোটেলের রিসেপশনে যারা বসে তাদের ব্যবহারও সাংঘাতিক রকমের খারাপ । আমি ইতিমধ্যেই হলিডে-আই-কিউ এ এই হোটেলের পেজে আমার রিভিউ লিখে ফেলেছি । জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করতে হবে ।

দুপুরে আমরা এখান থেকেই খেয়ে নিলাম । মমতা হোটেলের খাবারের মান তুলনামূলকভাবে খারাপ নয়, ভাত মাছ ডিম চিকেন নিয়ে খরচ পড়ল ১,৬১৪/- টাকা । খাওয়া শেষ করে ঘরে এলাম তখন বিকেল সাড়ে তিনটে বেজে গেছে । আমাদের ট্রেন দেরি না করলে প্রথমদিনটা হয়তো আমরা কিছুটা ঘুরতে পারতাম, কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্ন ওঠে না । তাই যে যার ঘরে বিশ্রাম নিয়ে আর আড্ডা মেরে সন্ধ্যেটা কাটিয়ে দিলাম । রাতে ফ্রাইড রাইস, রুটি, চিকেন কারি ইত্যাদি খাওয়া হল । খরচ হল ১,০৬৯/- টাকা ।

হোটেল আনন্দলোকের ঘর
পরেরদিন ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬ শুক্রবার । সকালে উঠে আমাদের প্রথম কাজ হল মালপত্র গুছিয়ে হোটেল থেকে চেক্‌ আউট করা । হ্যাঁ, আমরা এটাই করেছি । এদের কাছে আমাদের যা অগ্রিম দেওয়া ছিল তার থেকে একদিনের ভাড়া বাদ দিয়ে বাকিটা ফেরৎ নিয়ে সকাল ন'টা নাগাদ মমতা হোটেলের বিরক্তিকর পরিষেবা থেকে বেরিয়ে আমরা চলে গেলাম 'হোটেল আনন্দলোক'-এ । এই হোটেলটা আগেরদিন সন্ধ্যেবেলাই ঠিক করা হয়েছিল । এটা দারুণ কিছু না হলেও মমতা-র থেকে ভালো । একটা সমস্যা হল এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই । তবে বাজারের কাছে হওয়ায় কাছাকাছির মধ্যে খাওয়ার জায়গার অভাব নেই ।

এবার আমাদের ঘুরতে বেরোনো । রাজগীরে এসে ইতিমধ্যেই অনেক সময় নষ্ট হয়েছে । হোটেলের কাছে একটা দোকান থেকে কচুরি-জিলিপি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে একটা টাটাসুমো নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের প্রথমদিনের গন্তব্য 'নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়'-এর ধ্বংসস্তূপ দেখতে ।

রাজগীরের কাছাকাছি যেসব দেখার জায়গা আছে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তারমধ্যে সবথেকে বেশি ঘ্যাম । রাজগীর থেকে নালন্দা যেতে গাড়িতে আধঘন্টা মতো লাগে । এখানে গিয়ে দেখলাম প্রচন্ড ভীড় - ৩০শে ডিসেম্বরের ছুটিতে শুধু দূরের পর্যটকরা নয়, স্থানীয় লোকজন এমনকি কয়েকটা স্কুলের বাচ্চারাও হাজির হয়েছে ।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় 'আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া' রক্ষণাবেক্ষণ করে । এবং এটা 'ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টি' । ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ১৫/- টাকা এবং পনেরো বছরের নিচে ফ্রি । মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটা বড় চৌহদ্দী আছে, গেট দিয়ে ঢোকার পর সেটা দেখতে পাওয়া যায় । এখানে বেশ সুন্দর করে ছাঁটা ঘাস, ফুলের বাগান ইত্যাদি রয়েছে ।

এরপর আমরা মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকলাম । এই জাতীয় ঐতিহাসিক জায়গায় একজন গাইড নিলে ভালো দেখা যায় এটা আগেও দেখেছি, (মুর্শিদাবাদের সেই গাইডের কথা আমি কখনও ভুলব না "জানলে ইতিহাস আর না জানলে মাটির দেওয়াল") তাই আমরা ২০০/- টাকা দিয়ে একজন গাইড ভাড়া করলাম । সেই গাইড আমাদের পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখাল । আমি এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিস্তারিত লিখব না, এই সম্পর্কে ইন্টারনেটে অনেক লেখা পাওয়া যায় । আমি শুধু সেটাই লিখছি যেটা আমরা নিজের চোখে দেখেছি আর নিজের কানে শুনেছি ।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আনুমানিক পঞ্চম ও ষষ্ঠ খ্রীষ্টাব্দ থেকে তৈরি শুরু হয় । গুপ্ত বংশের আমলে এর খ্যাতি খুব বেশি হয় । এরপর বিভিন্ন রাজবংশের আমলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠনগত নির্মাণের কিছু পরিবর্তন করা হয় । আমাদের গাইড আমাদের একটা বিশাল চত্বরে নিয়ে গেল যেটাকে আধুনিককালের একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হোস্টেল বা ছাত্রাবাস বলা যেতে পারে । এখানে ছাত্রদের জন্য থাকার ঘর, জলের জন্য কুয়ো, রান্নার ব্যবস্থা ইত্যাদি তো রয়েইছে, সেইসঙ্গে আছে পড়াশোনা এবং অধ্যাপকের থাকার ব্যবস্থা । নালন্দায় সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়ে পড়ানো হত । এখানে বলে রাখি নালন্দার ধ্বংসস্তূপ মাটির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল, ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিভাগ এই নিয়ে কাজ করছে । এখনও এর বেশ কিছু অংশ মাটির নিচেই আছে বলে অনুমান করা হয় । যতটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তার মধ্যে আমাদের দেখা ছাত্রাবাসের মতো মোট ন'টা ছাত্রাবাস আছে । প্রত্যেকটা ছাত্রাবাসের বাইরে একটা করে বৌদ্ধমন্দির রয়েছে । প্রত্যেকদিন অধ্যায়নের শুরু এবং শেষে ছাত্রদের এখানে একবার করে পুজো করতে হত ।

ছাত্রাবাস
ছাত্রাবাসে প্রত্যেক ছাত্র এবং শিক্ষকের নিজস্ব ঘরের ব্যবস্থা ছিল, অর্থাৎ এখনকার দিনের হোস্টেলের মতো একই ঘরে একের বেশি ছাত্রকে থাকতে হত না । রান্নাবান্না ছাত্রদেরই করতে হত এবং নিজেদের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম্মও নিজেদেরই করতে হত । নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সেইযুগে শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ছিল, সারা দেশ থেকে ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত । কিন্তু চাইলেই এখানে পড়াশোনার সুযোগ মিলত না, নালন্দার প্রবেশিকা পরীক্ষা ছিল রীতিমতো কঠিন । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারে যে দ্বারপাল থাকত, বাইরে থেকে আসা ছাত্রদের প্রথমে তার কাছে পরীক্ষা দিতে হত । সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি মিলত, না হলে সেখান থেকেই ফিরে যেতে হত । এইভাবে প্রত্যেক বছর মাত্র ৩০% ছাত্র নালন্দায় প্রবেশ করতে পারত । আমাদের গাইড হিন্দীতে বলল "তাহলেই বুঝে দেখুন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারপালই এত পন্ডিত, সেখানকার অধ্যাপকরা কিরকম হত !"

নালন্দার সেই স্তূপ
ছাত্রাবাসের বাইরে মাঠের মধ্যে অনেক ছোট ছোট বৌদ্ধস্তূপ ছড়িয়ে রয়েছে । এসব ছাড়া যেটা বেশি করে চোখে পড়ে সেটা হল নালন্দার সেই বিখ্যাত স্তূপ - যেটা আমরা ইতিহাস বইয়ের পাতায় সবসময়ে দেখতে পাই । মজার ব্যাপার হল এটা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগোয়া হলেও এর সঙ্গে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সম্পর্ক নেই - এটা সম্রাট অশোকের সময়ে তৈরি । আমরা এই চত্বরে আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বেরিয়ে পড়লাম ।

পাওয়াপুরী
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য 'পাওয়াপুরী' । এখানে একটা জৈনমন্দির আছে । নালন্দা থেকে পাওয়াপুরী যেতে কুড়ি মিনিট মতো লাগে । পাওয়াপুরীর মন্দিরের বৈশিষ্ট্য হল এটা একটা হ্রদের মাঝখানে । হ্রদের পাড় থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে মন্দির পর্যন্ত্য । এখান দিয়ে যাওয়ার সময়ে জলের মধ্যে মাছ, হাঁস প্রভৃতি দেখা যায় ।  মন্দিরটা সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরের তৈরি । চত্বরটা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন । আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম ।

বিকেল প্রায় চারটে বাজে এবং এখনও পর্যন্ত্য আমাদের দুপুরের খাওয়া হয়নি । পাওয়াপুরী থেকে অল্প কিছুটা আসার পর এক জায়গায় আমাদের গাড়ি লাঞ্চের জন্য দাঁড়াল । এখানে ভাত-ডিম-চিকেন নিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ১,৪৪০/- টাকা । এরপর আমরা রাজগীর ফিরে এলাম । সারাদিনের ঘোরার জন্য গাড়ি নিল ১,০০০/- টাকা ।

আমরা হোটেলে ফিরেছি সন্ধ্যেবেলা । ঘরে বসে কিছু করার নেই, তাই আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম - এবার পদব্রজে । আমাদের হোটেলটা একেবারেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে - দোকানপাট থেকে শুরু করে খাবার জায়গা সবই এখানে । আমরা কয়েকটা দোকান ঘোরাঘুরি করে কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করলাম । বলা বাহুল্য, এমন কোনও জিনিস নেই যা কলকাতায় পাওয়া যায় না, তবে বেড়াতে গিয়ে সেই জায়গা থেকে কিছু কেনাকাটা করা কিছু মানুষের অভ্যেস আর সেরকম মানুষ আমাদের দলেও আছে !

রাত্রি সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা হোটেলে ফিরে এলাম । রাজগীরে রাত্রের দিকে বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়ে আর এর মধ্যে কেউই বাইরে বেরিয়ে খেতে যেতে চাইলাম না । কাছাকাছি একটা হোটেল থেকে ডিনার আনিয়ে খাওয়া হল । ভাত-রুটি-চিকেন নিয়ে খরচ পড়ল ৯৫০/- টাকা ।

টাঙ্গা
৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ শনিবার । সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করলাম আগেরদিনের দোকান থেকেই - কচুরি-তরকারী দিয়ে । রাজগীরে একটা বড় সমস্যা হল লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর জন্য কোনও গাড়ি পাওয়া যায় না, শুধুমাত্র টাঙ্গাই ভরসা । এটাই নাকি এখানে গাড়িওয়ালাদের সঙ্গে টাঙ্গাওয়ালাদের চুক্তি । কোনও গাড়ি লোক্যাল ঘোরাঘুরির জন্য পাওয়া যাবে না । টাঙ্গার রেটও বেশ বেশি, টাঙ্গাপিছু ১,২৫০/- টাকা । একটা টাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি পাঁচজন যাত্রী বসতে পারে, কিন্তু তার থেকে কম লোক হলেও ওই টাকাই দিতে হবে । টাঙ্গাদের ইউনিয়ন বেশ শক্তিশালী আর কিছুক্ষণ দরাদরি করেও যখন এরা কিছু কম করল না, তখন বাধ্য হয়ে আমরা এই টাকাতেই যেতে রাজী হলাম ।

মনিয়ার মঠ
টাঙ্গাতে চড়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য হল 'মনিয়ার মঠ' । এখানে একটা বৌদ্ধ স্তূপের মত আছে । তবে অন্য স্তূপের সঙ্গে এর পার্থক্য হল এর ভেতরটা ফাঁপা । এর দেওয়ালে বুদ্ধের কিছু ছবি আছে । এছাড়া এখানে হিন্দু নাগদেবীরও অবস্থান আছে বলে মনে করা হয় । জায়গাটায় দেখার সেরকম কিছু নেই আর সবটা দেখতে মিনিট পনেরোর বেশি লাগে না ।

সোনা ভান্ডার

দ্বিতীয় গন্তব্য হল 'সোনা ভান্ডার' । টাঙ্গাকে একই জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে মনিয়ার মঠ থেকে ভেতরের দিকের রাস্তা দিয়ে আরও ৬৫০ মিটার হেঁটে গেলে দেখতে পাওয়া যায় একটা অনতিউচ্চ পাহাড় । এই পাহাড়ের নামই 'সোনা ভান্ডার' । এর ভূ-তাত্বিক বৈশিষ্ট্য হল এর মধ্যে দু'টো বেশ বড় ফাঁকা ঘরের মতো আছে আর এই পুরো ব্যাপারটাই একটামাত্র বড় পাথর কেটে তৈরি । মনে করার হয় এটা আসলে রাজা বিম্বিসারের স্বর্ণভান্ডারের প্রবেশপথ । এর দেওয়ালে শঙ্খলিপিতে কিছু লেখা আছে যেটা আসলে সেই স্বর্ণভান্ডারে প্রবেশ করার সংকেত । তবে আজ পর্যন্ত্য সেই লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি আর তাই বিম্বিসারের স্বর্ণভান্ডারও অধরাই থেকে গেছে ! (তবে সবার জন্য অধরা নয়, অচেনা লিপির পাঠোদ্ধার করে ব্যাগে যতটা ধরে ততটা সোনা আমি নিজে নিয়ে এসেছি, কাউকে দেব না !) পাথরের ওপর পা দিয়ে এই পাহাড়ের মাথায় ওঠা যায়, আমরা উঠে ছবিটবি তুলে নেমে এলাম ।

বিশ্বশান্তি স্তূপের তোরণদ্বার
তৃতীয় গন্তব্য হল 'বিশ্ব শান্তি স্তূপ' - রাজগীরের লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর সবথেকে উল্লেখযোগ্য জায়গা । শান্তিস্তূপটা গৃধকূট পাহাড়ের ওপরে আর পাহাড়ে ওঠার জন্য রোপ-ওয়ে চলে । এই রোপ-ওয়ে সম্পর্কে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে এটা নাকি চারদিক খোলা । এটা একটা ভুল তথ্য - এগুলো বলতে গেলে চারদিকটাই ঘেরা । তবে এর একটা বৈশিষ্ট্য হল এর একটায় একজনই উঠতে পারে আর এগুলো চলার পথে কখনও থামে না । অর্থাৎ চলন্ত রোপ-ওয়েতে উঠতে হয় যদিও সেটার গতি এতটাই কম যে উঠতে কোনও অসুবিধে হয় না । এই রোপওয়েতে ওঠার টিকিট ১০০/- টাকা করে যদিও আমরা এতে উঠিনি । সামনে প্রায় ২০০ - ২৫০ জন লোকের লাইন, উঠতে গেলে ঘন্টা দু'য়েক এখানেই কেটে যাবে, তাই আমরা শান্তিস্তূপ দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করলাম ।

বিম্বিসার জেল
এতক্ষণ আমরা আমাদের শুরুর জায়গা থেকে ক্রমশই দূরে যাচ্ছিলাম, এবার ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার পথে দেখার জায়গা 'বিম্বিসার জেল' । এখানে রাজা বিম্বিসারকে তাঁর ছেলে অজাতশত্রু বন্দী করে রেখেছিল । এই জায়গাটা বিম্বিসার নিজেই পছন্দ করেছিলেন বন্দী থাকার জন্য । এখান থেকে গৃধকূট পাহাড় সরাসরি দেখা যায়, তাই বিম্বিসার এখানে থেকে ভগবান বুদ্ধকে প্রতক্ষ্য করতে চেয়েছিলেন । বিম্বিসার জেল এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রায় । এখন একটা জেলের পাঁচিলের শুধুমাত্র নিচের অংশটা রয়েছে । এখানে মিনিট দশেক কাটিয়ে আমরা আবার ফেরার পথে চলতে শুরু করলাম ।

দুপুর প্রায় আড়াইটে বাজে, তাই এবার একটা জায়গায় লাঞ্চ সেরে নেওয়া হল । খাবারের মান খুব একটা ভালো নয়, মোটামুটি যতটা সম্ভব গর্তবোঝাই করা হল । খরচ হল ১,০৫৫/- টাকা ।


উষ্ণপ্রস্রবণ
খাবারের জায়গা থেকে সামান্য হেঁটে পৌছলাম আমাদের পঞ্চম গন্তব্য 'শতধারা কুন্ড' বা উষ্ণপ্রস্রবণ । মাটির অনেকটা নিচ থেকে সরাসরি উঠে আসে বলে এই জল বেশ গরম হয় এটা প্রচলিত মত হলেও আসলে বেশিরভাগ উষ্ণপ্রস্রবণের জলই কৃত্রিম উপায়ে গরম করা হয় । এখানে চান করার যে কুন্ডটা রয়েছে একটা পাঁচিলের উপর দিয়ে সেটা দেখা যায় । দেখলাম জলের বেগ খুবই কম যদিও তার মধ্যেই প্রচুর সংখ্যক মানুষ চান করছে । উষ্ণপ্রস্রবণে চান করাটা একটা আধ্যাত্মিক ব্যাপার, এটা করলে পুণ্য অর্জন করা যায়, এই বিশ্বাস থেকেই ঠান্ডাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে লোকজন চান করছে - করে ।

জৈন মিউজিয়াম
এবার মেইন রাস্তাটা ছেড়ে আমরা অন্য আরেকটা রাস্তা ধরলাম । এই রাস্তার পাশে নবনির্মিয়মান নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল দেখা গেল । কিছুদূর চলার পরে পড়ল একটা মিউজিয়াম - এটা একটা জৈন মিউজিয়াম । বিহারের ইতিহাস গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে মহাবীরের জন্যও বিখ্যাত, এখানে মহাবীরেরও নানারকম সৌধ আছে । এই জৈন মিউজিয়ামে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়, মূল্য ২০/- টাকা । এখানে মিউজিয়ামের ভিতরে ক্যামেরার ব্যবহার নিষিদ্ধ । মিউজিয়ামটা খুবই সুন্দর - মহাবীরের এবং আরও কিছু জৈন বিখ্যাত লোকেদের জীবনের নানারকম বিখ্যাত ঘটনাকে মডেলের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে । আমাদের হাতে সময় বেশি নেই, তাই মডেলগুলো আর সেইসঙ্গে তার ওপরের লেখাগুলো একবার করে চোখ বুলিয়ে বেরিয়ে বেরিয়ে এলাম । জৈন ইতিহাস ভালো করে জানার ইচ্ছে থাকুক আর না থাকুক, এই মিউজিয়ামটা সময় নিয়ে দেখা অবশ্যই উচিৎ । দেখতে ভালোও লাগবে বলে আমার বিশ্বাস ।

জাপানী মন্দিরে বুদ্ধমূর্তি
এবার আবার ফেরার পথ ধরলাম । একটু এগোতেই পড়ল আমাদের সপ্তম তথা শেষ গন্তব্য 'জাপানী মন্দির' । এটা আর পাঁচটা জাপানী মন্দিরের মতোই (যদিও জাপানী মন্দির জিনিসটা শিবমন্দিরের মতো কমন্‌ নয়, পাড়ায় পাড়ায় একটা করে থাকে না !) এবং এখানে একটা বিরাট বুদ্ধমূর্তি আছে । এখানে ভেতরে উপাসনা (অথবা ওই জাতীয় কিছু) চলছিল আর সেইসঙ্গে গমগম শব্দে দামামা বাজছিল । আর সেইসঙ্গে বাজছিল কোনও একটা জাপানী সুর । আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম । সায়োনারা !

টাঙ্গা আমাদের যেখান থেকে তুলেছিল, সেখানেই নামিয়ে দিল । বিকেল পাঁচটা বাজে, আমরা বাড়ি ফেরার পথে রওনা হব সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ । আমাদের ফেরার ট্রেন আর রাজগীর থেকে ধরা যাবে না, আমাদের যেতে হবে বখ্‌তিয়ারপুর আর সেটা যেতে হবে গাড়িতে । রাত ১০ঃ০৯ মিনিটের রাজেন্দ্রনগর হাওড়া এক্সপ্রেসে আমাদের ফেরার কথা । রাজগীর থেকে বখ্‌তিয়ারপুরের দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার আর গাড়িতে ঘন্টা দেড়েকের বেশি লাগার কথা নয়, কিন্তু এখানে রাতের দিকে প্রচন্ড কুয়াশা হয় আর তখন গাড়ি খুব সাবধানে ধীরে ধীরে চালাতে হয় । তাই ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না । আমরা আগেরদিন যে দোকান থেকে ডিনার আনিয়েছিলাম, সেই দোকানেই ডিনারের অর্ডার দিয়ে দিলাম । আমাদের গাড়ি ছাড়ার আগে আমরা এখান থেকে প্যাক করা খাবার নিয়ে নেব ।

হোটেলে ফিরে মালপত্র গুছিয়ে চেক্‌আউট করতে করতে কিছুটা দেরি হয়েই গেল । খাবার নিয়ে আমরা যখন রাজগীর ছেড়ে বখ্‌তিয়ারপুরের দিকে রওনা হলাম, তখন প্রায় সাড়ে সাতটা ।

আমাদের ড্রাইভার ঠিকই বলেছিল । রাস্তায় জায়গায় জায়গায় কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি যে সামনের গাড়িটাও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না । এই অবস্থাটা হবে জানাই ছিল আর আমাদের হাতে সে'জন্য বেশি সময় নেওয়াও ছিল । আমরা যখন স্টেশনে পৌঁছলাম তখন প্রায় রাত ন'টা ।

রাজগীর অঞ্চলে রাতে কিরকম ঠান্ডা পড়ে সেটা আজ ভালোভাবে টের পেলাম । আগের দু'দিন এই সময়ে হোটেলে ছিলাম বলে ঠান্ডাটা সেভাবে গায়ে অনুভব করিনি । বখ্‌তিয়ারপুর স্টেশনে কোনও ওয়েটিং রুম নেই, তাই খোলা স্টেশনের মধ্যেই একটা ছাদওয়ালা জায়গায় বসে থাকতে হল । প্রচন্ড ঠান্ডা আর সেইসঙ্গে ঘন কুয়াশা । আমি ঠান্ডার জায়গায় এর আগেও গেছি, এর থেকে অনেক বেশি ঠান্ডায় থেকেছি । কিন্তু রাজগীরের মতো এরকম জমাট বাঁধা ঠান্ডা এর আগে সেভাবে কোথাও পাইনি । এই ঠান্ডাটা যেন ভীষণ বেশি করে গায়ের ওপর চেপে বসে । সেইসঙ্গে কুয়াশার জন্য আবহাওয়াটা খুব বেশি আর্দ্র । সবমিলিয়ে আমি এটা জোর দিয়ে বলতে পারি রাজগীরের এই ঠান্ডা এমনকি যারা ঠান্ডা বা শীত ভালোবাসে, তাদেরও খারাপ লাগতে বাধ্য ।

ট্রেন এল নির্ধারিত সময়ের প্রায় চল্লিশ মিনিট দেরিতে । আমাদের অপেক্ষার শেষের দিকটা আরও ভয়ঙ্কর - ট্রেন আসছে ঘোষণা করার পর আমরা উঠে গিয়ে আমাদের কামরা সম্ভাব্য যেখানে পড়তে পারে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম । সেখানে কোনও ছাউনিও নেই । নাক আর কান দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে - বড়দের থেকেও বেশি কষ্ট হচ্ছে বাচ্চাদের । ট্রেনে উঠে একটু গরম হওয়ার সুযোগ পেয়ে নিজেদের ধন্য মনে হল ।

চারবছর আগে কালুক থেকে ফেরার সময়ে ট্রেনে ইংরিজী নববর্ষ উদ্‌যাপন করেছিলাম, এবারে আবার সেটা হল । আমাদের দলের সবাই সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুয়ে পড়লাম । পরেরদিন সকালে ট্রেনের হাওড়া পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় সকাল ৬ঃ৩৫ মিনিট হলেও ট্রেন পৌঁছল প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা দেরিতে । স্টেশন থেকে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে দু'তিনদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে বেশি দূরে নয় এরকম একটা জায়গা হল আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের রাজগীর । জায়গাটা প্রধানতঃ ঐতিহাসিক দর্শনীয় জায়গা হিসেবে বিখ্যাত ।
২. হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে রাজগীরে সরাসরি কোনও এক্সপ্রেস ট্রেন যায় না, এর নিকটবর্তী বড় স্টেশন হল বখ্‌তিয়ারপুর । বখ্‌তিয়ারপুর থেকে চাইলে লোক্যাল ট্রেনে অথবা গাড়িতে রাজগীর যাওয়া যায় ।
৩. রাজগীর ঐতিহাসিক জায়গা হিসেবে সুবিখ্যাত হলেও ট্যুরিজমের দিক থেকে বিহার অনেকটাই পিছিয়ে । তাই ইন্টারনেট বা অন্যান্য বৈদ্যুতিন পরিষেবার মাধ্যমে এখানে ভালো হোটেল পাওয়া বেশ কঠিন ।
৪. রাজগীরে আমরা যে হোটেলে প্রথমে উঠেছিলাম, 'হোটেল মমতা' সেখানে না থাকার জন্যই সবাইকে বলব । আর আমরা যে দ্বিতীয় হোটেলটায় উঠেছিলাম, 'হোটেল আনন্দলোক' সেটা আগেরটার থেকে ভালো হলেও সেরকম কিছুও নয় । তাই এখানে কোনও হোটেলের যোগাযোগের নম্বরই দিলাম না । রাজগীরের হোটেল নিজের ঝুঁকিতেই বুক করা ভাল !
৫. রাজগীরের কাছাকাছি সবথেকে ঘ্যাম জায়গা হল 'নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়'-এর ধ্বংসাবশেষ । যদি ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ থাকে, তাহলে নালন্দা সম্পর্কে আগে থেকে একটু জেনে গেলে ভালো লাগবে ।
৬. নালন্দায় ঘোরার জন্য কমপক্ষে হাতে ঘন্টাতিনেক সময় নিয়ে যাওয়া দরকার । এবং একজন গাইড সঙ্গে থাকলে ভালোই লাগবে ।
৭. এখান থেকে কাছেই হল পাওয়াপুরীতে জৈনমন্দির । লেকের মাঝখানে তৈরি মন্দিরটা দেখতে ভাল লাগবে ।
৮. রাজগীরের লোক্যাল সাইটসিয়িং-এর মধ্যে বিশ্বশান্তি স্তূপ, বিম্বিসার জেল আর জৈন মিউজিয়ামটাই দেখার মতো - বাকিগুলোতে যাওয়া সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয় । লোক্যাল সাইটসিয়িং-এর জন্য এখানে গাড়ি পাওয়া যায় না, টাঙ্গাই ভরসা ।
৯. প্রচন্ড শীতে রাজগীরে না যাওয়াই ভালো - কারণ এখানকার ঠান্ডা খুব খারাপ, শরীর রীতিমতো খারাপ হয়ে যায় ।
১০. কিছুটা মালভূমি ধরণের জায়গা হওয়া সত্ত্বেও রাজগীরের জল খুব একটা ভালো না, বিশেষ করে 'এখানকার জলে খুব ভালো হজম হয়' এই কথাটা রাজগীরের সম্পর্কে একেবারেই খাটে না ।

উপসংহারঃ


রাজগীর !
ভারতবর্ষের প্রাচীণ যুগের ইতিহাস নিয়ে আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে রাজগীর একটা দর্শনীয় জায়গা । প্রধানতঃ বৌদ্ধ ও কিছুটা জৈনধর্মের জন্য বিখ্যাত এই জায়গা এখনও ইতিহাসের বেশ কিছু সাক্ষ্য বহন করে । এছাড়া পরবর্তীকালেরও কিছু কিছু রাজবংশের কীর্তিকলাপের নিদর্শন দেখা যায় এই রাজগীরে । তবে সুদীর্ঘকাল ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বেশিরভাগ নির্মাণগুলোকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে । রাজগীরের খুব কাছেই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে । নালন্দা শুধু ভারতবর্ষের নয়, ততকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষার পীঠস্থান বলে মনে করা হয় । এই নালন্দা রাজগীর ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দেখার জায়গা । এছাড়া কাছাকাছির মধ্যে আরও কিছু দেখার জায়গাও আছে । তবে এ'কথা বলতেই হবে যে প্রধানতঃ বেড়ানোর জায়গা হিসেবে বিখ্যাত হলেও এখানকার মানুষের মধ্যে অতিথিবৎসলতার কিছুটা অভাব রয়েছে - এখানকার মানুষ এখনও ট্যুরিজমের দিক থেকে সেভাবে উন্নত নয় । জায়গাটা বেশ অপরিষ্কার - 'বিহার' বলতেই যা যা মনে পড়ে তার সবই এখানে রয়েছে । তবে এইসব প্রতিকূলতাগুলো কিছুটা মানিয়ে নিতে পারলে দেখার জায়গা হিসেবে রাজগীর-নালন্দা বেশ ভালো । অল্পখরচ আর দিনতিনেকের ছুটি পুঁজি থাকলে অনায়াসেই বেরিয়ে পড়া যেতে পারে !

রাজগীর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Tuesday, October 25, 2016

তাকদা ভ্রমণ

তাকদা । নামটা শুনে প্রথমেই লোকজন জিজ্ঞেস করে "কি ? চাকদা? চাকদায় আবার বেড়াতে যাওয়ার কি আছে ?" তাদের বলতে হয় - না, এই জায়গাটার নাম তাকদা । দার্জিলিঙ জেলার ছোট্ট একটা গ্রাম । দার্জিলিঙ জেলায় 'ততটা বিখ্যাত নয়' এরকম যে বেড়ানোর জায়গাগুলো আছে, তাদের মধ্যে অন্যতম । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫,৫০০ ফুট উচ্চতায় আর শিলিগুড়ি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই সুন্দর জায়গায় তিনদিনের বেড়ানো নিয়ে আমার ব্লগের এবারের পোস্ট ।

২০শে অক্টোবর, ২০১৬ বৃহস্পতিবার শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে রাত সাড়ে আটটায় আমাদের যাত্রা শুরু - গন্তব্য নিউ জলপাইগুড়ি । কাঞ্চনকন্যার সমস্যা হল এর স্টপেজ খুব বেশি । তবে এটা সকাল সাড়ে সাতটায় নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছয় শুধুমাত্র এই কারণেই আমরা এই ট্রেনটা পছন্দ করেছিলাম ।

এটা আমাদের দরকার ছিল কারণ আমরা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তাকদা যাওয়ার জন্য 'দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে' (টয়ট্রেন) বুকিং করেছিলাম । টয়ট্রেন ছাড়ে সকাল ৮ঃ৩০ -এ । টয়ট্রেন তাকদা যায় না, ঠিক ছিল আমরা 'ঘুম' পর্যন্ত্য টয়ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে গাড়িতে তাকদা যাব । কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ভারতীয় রেল কিছুদিনের জন্য টয়ট্রেনের পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে, তাই আমাদের এই কাঞ্চনকন্যায় যাওয়াটা অর্থহীন হয়ে গেল ।


কাঞ্চনকন্যা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা
আমাদের এবারের দল ৩ জন শিশুসমেত ১৩ জনের । বাবা, মা, আমি, অমৃতা, কথা, কলি, আমার বড়মাসি, কঙ্কনাদি, অমিতদা, মিঙ্কা, বৈশাখী, কাকিমা আর সমীরণদা - এককথায় বলতে গেলে আমাদের নিয়মিত দলের প্রায় সবাই আর সেইসঙ্গে আমার বড়মাসি । আমাদের ট্রেন প্রথমদিকে কিছুটা দেরিতে চললেও নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে দিল প্রায় সঠিক সময়ে । ট্রেন যখন প্রায় নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ঢুকছে, ট্রেন থেকে দেখা গেল কাঞ্চনজঙ্ঘা । এটা আমাদের একটা খুব বড় প্রাপ্তি । আমি নিজে এই জিনিস আগে দেখে থাকলেও জানি খুব বেশি লোকের এটা দেখার সৌভাগ্য হয় না । তাকদায় আমরা যেখানে থাকব, সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোনও ভিউ নেই, তাই এখান থেকেই যা দেখার দেখে নিলাম ।

তিস্তা ব্রীজের কাছে ব্রেকফাস্ট ব্রেক

একটা ১০৫ বছরের পুরনো ব্রিটিশ হেরিটেজ বাংলো তাকদায় থাকার জন্য সুপরিচিত (এই ১০৫ সংখ্যাটা অবশ্য অনেকদিন আপডেট হয়নি !) - এছাড়া আর দু'একটা থাকার জায়গা আছে । টয়ট্রেন না থাকায় আমরা বাংলো থেকেই একটা গাড়ি বুক করে রেখেছিলাম কারণ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে তাকদা যাওয়ার গাড়ি পাওয়া সহজ নয় । স্টেশন থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে রওনা দিতে দিতে সাড়ে আটটা বেজে গেল । আমাদের দলে পূর্ণবয়স্ক লোকের সংখ্যা ১০ আর সবাই একটা টাটা সুমোতে (একটু হয়তো বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে কিন্তু পাহাড়ে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় । যেভাবেই হোক সবার জায়গা হয়েও গেল )। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তাকদা হিলকার্ট রোডে হয়েও যাওয়া যায় আবার সেভক হয়েও যাওয়া যায় - আমরা দ্বিতীয়টা ধরলাম । ঘন্টাখানেক চলার পর তিস্তা ব্রীজের কাছে ব্রেকফাস্টের জন্য দাঁড়ানো হল । চিকেন চাউমিন, ভেজ মোমো, চিকেন থুকপা, ছোলে-বাটুরে এইসব দিয়ে ভালো করে ব্রেকফাস্ট করে নেওয়া হল । খরচ হল মোট ১,৪০০/- টাকা ।

তাকদায় পৌঁছনোর রাস্তার শেষের দিকটা বেশ খারাপ । গাড়িতে ১০ জন বসে এতক্ষণ একটু চাপাচাপি হচ্ছিল কিন্তু এই রাস্তায় এসে গাড়ির ভেতরে এমন 'মুড়ির টিন' ঝাঁকানি শুরু হল যে একসময়ে মনে হচ্ছিল গাড়িতে বোধহয় চাইলে আরও একজনের জায়গা হয়ে যাবে !

তাকদায় ব্রিটিশ হেরিটেজ বাংলো
তাকদা পৌঁছলাম দুপুর একটা নাগাদ । আমরা থাকার জন্য ব্রিটিশ বাংলোয় দু'টো ডাবল বেড আর দু'টো ট্রিপল বেড ঘর বুক করেছিলাম । বাংলোটা একটা L আকৃতির বাড়ি । এর একটা দিকে চারটে ব্রিটিশ আমলের ঘর । অন্যদিকে দু'টো ঘর যেগুলো পরবর্তীকালে তৈরি । ব্রিটিশ আমলের ঘরগুলোর ভেতরে ফায়ারপ্লেস আছে, চাইলে ব্যবহার করা যায় (অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে) । তাকদায় ঠান্ডা খুব বেশি নয়, দিনের বেলা সোয়েটার লাগে না আর রাত্রিবেলা ঘরের বাইরে বেরোলে একটা জাম্পার বা জ্যাকেট থাকলেই চলে । তবে এমনিতে ঠান্ডা সেরকম না লাগলেও একটা ঠান্ডা হাওয়া মাঝে মাঝে দিচ্ছিল যেটা বেশ আরামদায়ক ।

আমরা চানটান সেরে নিলাম । বাথরুমে গিজারের ব্যবস্থা আছে । এখানে আগেই আমরা দুপুরের খাবারের কথা বলে রেখেছিলাম । সেইমতো দুপুরে এরা আমাদের ভাত, ডাল, স্কোয়াশের তরকারি, ডাবল ডিমের এগ্‌কারি দিল । এই ব্রিটিশ বাংলোয় খাওয়ার জন্য মাথাপিছু প্রতিদিন ৬০০/- লাগে । এর মধ্যে পাওয়া যায় -
সকালে ঃ বেড-টি, ব্রেকফাস্ট (লুচি-তরকারী/পরোটা-তরকারী/পাঁউরুটি টোস্ট), আবার চা
দুপুরে ঃ ভাত, ডাল, তরকারী, ডাবল ডিমের এগ্‌কারি
বিকেলে ঃ চা, পপকর্ণ
রাতে ঃ ভাত/রুটি, চিকেন
বাংলোর ব্যালকনিতে - রাতের বেলায়
দুপুরে খাওয়ার পর বাংলোর লনে এসে বসলাম । এখান থেকে সামনের পাহাড়ের ভিউ চমৎকার । দলে বেশি লোকজন থাকার সুবিধে হচ্ছে স্রেফ আড্ডা মেরে সময় কেটে যায় । দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল, আমাদের বাংলোর পিছনের পাহাড়ের ওপরে একসময়ে সূর্য্যাস্ত হয়ে গেল । এইসময়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য্য সত্যিই অসাধারণ । আশেপাশের পাহাড়গুলোর ওপর ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসার দৃশ্য দেখতে দেখতে কিভাবে যেন সময় কেটে যায় । একসময়ে সেইসব পাহাড়গুলোর ওপরের জনবসতিগুলোয় একটু একটু করে আলো জ্বলে উঠল । আমরা বাংলোর ব্যালকনিতে বসে সন্ধ্যের চা খেলাম আর আড্ডা চলতেই থাকল । শতাধিক পুরনো ব্রিটিশ বাংলোয় কোনও ভূতের গল্প আছে কিনা জানি না তাই আমরা নিজেরাই কিছু তৈরি করে নিলাম (ভেবেছিলাম ভূত নিয়ে আলোচনা করলে হয়তো তাদের দেখা মিললেও মিলতে পারে, কিন্তু সে গুড়ে বালি !) । রাত্রি ন'টা নাগাদ খাওয়ার ঘরের ডাকে সাড়া দিয়ে দেখলাম আমাদের জন্য রুটি আর চিকেন কারি রেডি ।

পরেরদিন ২২শে অক্টোবর, ২০১৬ শনিবার । তাকদায় প্রকৃতপক্ষে দেখার খুব বেশি কিছু নেই, আমাদের বাংলোর ম্যানেজার তাই আগেই বলে রেখেছিলেন কালিম্পং-এর দিকটা যাওয়ার জন্য । সেইমতো সকাল সাড়ে ন'টা নাগাদ আমরা বেরোলাম । ঘন্টাখানেক যাওয়ার পর পড়ল আমাদের প্রথম গন্তব্য - 'তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট' ।

তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট থেকে ভিউ
তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট থেকে অনেকগুলো পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায় । এখানে একটা ছোট টাওয়ার গোছের আছে, তার ওপরে বসার জায়গাও আছে । এখানে ওঠার জন্য অল্প কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙ্গতে হয় আর সেটা করা সার্থক । আমরা ভিউপয়েন্ট থেকে বেশি কিছু ছবি তুললাম । এখানে সবমিলিয়ে মিনিট পনেরো থাকার পর এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য 'ছোটামাঙ্গয়া অরেঞ্জ গার্ডেন'-এর দিকে ।

অরেঞ্জ গার্ডেন
তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট থেকে অরেঞ্জ গার্ডেন আরও ৪৫ মিনিট মতো লাগল । দূরত্ব খুব বেশি না, তবে রাস্তা খারাপ হওয়ায় সময় লাগে । অরেঞ্জ গার্ডেনে ঢুকতে মাথাপিছু ৩০/- টাকা করে টিকিট লাগে । পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে এখানে কমলালেবুর চাষ করা হয়, তবে কমলালেবু ছাড়াও বাগানে আরও অনেক গাছ আছে (কি কি গাছ তখন জেনেছিলাম, এখন আর সেভাবে মনে নেই) । একটা বাঁশগাছ দেখলাম, সেটা হচ্ছে জাপানি বাঁশ গাছ । এর বৈশিষ্ট্য হল এর গা ভীষণ মসৃণ । এছাড়া বাগানটার মধ্যে দিয়ে একটা ছোট ঝর্ণা নেমে গেছে সেটাও খুব সুন্দর । সম্পূর্ণভাবে মানুষের হাতের তৈরি হলেও বাগানটায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য স্পষ্ট ।

অরেঞ্জ গার্ডেনের ভেতরে একটা ফ্যাক্টরি আছে, এখানে অরেঞ্জ জুস, অরেঞ্জ স্কোয়াশ তৈরি হয় । এখানে বিক্রির ব্যবস্থাও আছে । আমরা সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলাম । এখানে অরেঞ্জ জুস, স্কোয়াশ ছাড়াও লঙ্কা ইত্যাদি পাওয়া যায় । আমরা অবশ্য কিছু কিনিনি । বাগান থেকে বেরিয়ে এসে আমরা রওনা দিলাম কালিম্পং এর দিকে ।

কালিম্পং শহর
ছোটামাঙ্গয়া থেকে কালিম্পং পৌঁছতে আরও একঘন্টা মতো লাগল । কালিম্পং দার্জিলিঙ-এর মতো একটা হিলস্টেশন - অনেক পুরনো । এখানকার রাস্তাঘাট, দোকানপাট একেবারেই দার্জিলিঙ এর মতো, ভীড়ও দার্জিলিঙ-এর মতো । আমাদের প্ল্যানে কালিম্পং-এ সেভাবে দেখার কিছু ছিলনা, এখানে আমরা থামলাম লাঞ্চের জন্য । কালিম্পং-এ বাঙালি গিজগিজ করছে - আমরা 'মাসিমার হোটেল' দেখে সেখানে থামলাম । এটা কলকাতার একটা সাধারণ ভাতের হোটেলের মতোই - ভাত মাছ মাংস ডিম ডাল তরকারি সবই পাওয়া যায় । এখানে সবার লাঞ্চ করতে খরচ পড়ল ৯৭০/- টাকা ।

ডেলো পার্ক
এরপর আমরা এগিয়ে গেলাম আমাদের শেষ গন্তব্য ডেলো-র দিকে (হ্যাঁ, এই সেই ডেলো !) । কালিম্পং শহর থেকে কিছুটা দূরে একটা পাহাড়ের মাথায় একটা রিসর্ট আছে আর তার চারপাশটা নানারকমভাবে সাজানো হয়েছে । ডেলোয় ঢুকতে মাথাপিছু ১০/- টাকা করে টিকিট লাগে । আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ছবিটবি তুলে চলে এলাম । এখানে চাইলে প্যারা-গ্লাইডিং করা যেতে পারে । সাধারণভাবে ৩,০০০/- টাকা আর হাই-গ্লাইডিং এর জন্য ৫,০০০/- টাকা । আমরা কেউই করিনি তবে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছি ব্যাপারটা অনেকেই করে ।

এবার আমরা তাকদা ফেরার পথ ধরলাম । পাহাড়ে অন্ধকার খুব তাড়াতাড়ি নেমে আসে, কিছুক্ষণ গাড়ি চলার পরেই এমন অবস্থা হল যে হেডলাইট-এর আলোয় যেটুকু রাস্তা দেখা যাচ্ছে তার বাইরে আর কোথাও কিছু দৃশ্যমান নয় । একজায়গায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া হল । তারপর আবার চলা । অন্ধকারে পাহাড়ী পথে গাড়িতে চলার অভিজ্ঞতা বেশ সুন্দর । এর প্রধান কারণ হয়তো পাহাড়ে বেড়াতে গেলে রাতেরবেলা গাড়ি চড়ার সুযোগ কমই হয় । আমরা যখনই পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে সাইট-সিয়িং এ বেরোই, সাধারণতঃ সকাল সকাল বেরিয়ে বিকেল বা বড়জোর সন্ধ্যের মধ্যে হোটেলে ফিরে আসি । অন্ধকার হয়ে গেলে পাহাড়ে গাড়ি, লোকজন সবই কমে যায় আর সেইজন্যই হয়তো ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর লাগে । অন্ধকার রাস্তায় গাড়ি চলেছে, হেডলাইটের আলো রাস্তায়, রাস্তার ধারে পড়ছে আর সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে সামান্য গাড়ির ভেতরে ঢুকে গাড়ির ভেতরটাকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার হতে দিচ্ছে না - এই পরিবেশের যেন কোনও তুলনা হয় না । রাত্রির নিস্তব্ধতার একটা নিজস্ব সৌন্দর্য্য আছে আর সেটা এইসব সময়ে আরও বেশি করে বোঝা যায় । চলতে চলতে আমরা একটা পাশের পাহাড়ে অনেকটা ওপরদিকে একটা আলো জ্বলতে দেখলাম । আমাদের ড্রাইভার বলল সেটা 'স্যামড্রুপসে' । কালুক ভ্রমণের সময়ে আমরা এখানে গিয়েছিলাম ।

বাংলোয় ফিরলাম সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ । আবার আগেরদিনের মতোই - সন্ধ্যের পরে আর কিছু করার নেই । কিন্তু আমাদের বড় দল থাকায়, কিছু করার নেই বললেও অনেক কিছু করার থাকে । আবার আগেরদিনের মতোই ন'টার সময়ে ডিনার করে নিলাম । আমাদের কথা অনুযায়ী এরা ডিনারে চিলি-চিকেন রান্না করেছিল যদিও সেটা খুব ভালো কিছু হয়নি । এরা সাধারণভাবে এখানে চিকেন কারি রান্না করে আর সেটাই ভালো করতে পারে । অন্যরকম কিছু রান্না করতে বলার এক্সপেরিমেন্টটা এদের সঙ্গে না করাই ভালো !

তাকদায় সূর্য্যোদয়
পরেরদিন সকালে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম - পাঁচটার সময়ে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে লনে চলে এলাম । আকাশ এখনও অন্ধকার । সূর্য্যোদয় হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে । এই সময়ে বেশ ঠান্ডা লাগে । আমাদের বাংলোর পিছনে কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠলে তাকদা মনাস্ট্রি - এখান থেকে সূর্য্যোদয়ের দৃশ্য আরও সুন্দর । আমরা ক্যামেরা নিয়ে সেখানে গিয়ে বসে রইলাম । এই সময়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই একটা অভিজ্ঞতা - প্রতি মূহুর্তেই রঙ পাল্টাতে থাকে । পিছন দিকে তাকালে দেখা যায় দূরে একটা উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে ফ্লাশের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে । জেনেছিলাম ওটা দার্জিলিঙ এর টাইগার হিল ।

সূর্য্যোদয় হল । আমি লেখক নই - এই দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়ার মতো বিশেষণ আমার জানা নেই । শুধু এককথায় বলছি - অসাধারণ !

চা-বাগান
২৩শে অক্টোবর, ২০১৬ - রবিবার আমাদের তাকদার লোক্যাল সাইট-সিয়িং এর দিন । আগেই বলেছি তাকদায় দেখার সেরকম অনেক কিছু নেই, তাই আমরা বেরোলাম বেলা দশটা নাগাদ । এই যাওয়ার রাস্তাটা খুব সুন্দর । প্রথমে রাস্তাটা একটা পাইনফরেস্ট-এর মধ্যে দিয়ে চলল । কিছুক্ষণ চলার পর একটা অর্কিড গার্ডেন পড়ল । এখানে আমরা থামলাম না, ঠিক হল যদি ফেরার পথে সময় থাকে তাহলেই থামব । আরও এগিয়ে চলার পর শুরু হল রাস্তার দু'পাশের চা-বাগান । এখানকার 'রাংলি-রাংলিওট চা-বাগান' খুব বিখ্যাত । এই চা-বাগানের দৃশ্যও খুব সুন্দর - বিশেষ করে এরকম রাস্তার দু'পাশে চা-বাগান খুব বেশি দেখা যায় না । এই চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতেই পৌঁছে গেলাম আমাদের প্রথম স্টপেজ - 'তিস্তা ভ্যালি দূরবীন ভিউ পয়েন্ট'-এ ।

তিস্তা ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট থেকে তিস্তার ভিউ
প্রথমেই বলে রাখি এটাও একটা চা-বাগান । এই চা-বাগানের মধ্যেই একটা চাতাল মতো করা আছে - সেখানে দাঁড়িয়ে তিস্তা নদী আর তিস্তার ভ্যালি দেখা যায় । বেলা পৌনে বারোটা বাজে, আকাশে রোদের তেজও বেশ বেশী । কিন্তু এই ভিউ পয়েন্টে একটা চমৎকার ঠান্ডা হাওয়া দেয় যাতে খুব আরাম লাগছিল । এটা একটা ছবি তোলার জন্য আদর্শ জায়গা আর আমরা আমাদের সঙ্গে থাকা মোট পাঁচটা ক্যামেরার যথোপযুক্ত ব্যবহার করলাম । জায়গাটা এতটাই সুন্দর যে আমরা এখানে নির্ধারিত সময়ের অনেক বেশি সময় কাটিয়ে ফেললাম । কিন্তু তাতে আফশোসের কিছু নেই কারণ সব সুন্দর জায়গা কখনও দেখা হয়ে ওঠে না, তাই যেটা দেখছি সেটাকেই সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করার নামই জীবন । (কাব্য করে ফেললাম ! তবে এটাকে স্থানমাহাত্ম্য ছাড়া আর কিছু বলার নেই)

হ্যাঙ্গিং ব্রীজে যাওয়ার রাস্তা
এরপরের জায়গার নাম হল 'বারবাটে হ্যাঙ্গিং ব্রীজ' । তিস্তা ভ্যালি থেকে প্রায় একঘন্টা গাড়িতে যাওয়ার পর এখানে পৌঁছলাম । এখানে একটা শতবর্ষ পুরনো ঝুলন্ত সেতু আছে । একসময়ে এর ওপর দিয়ে জিপ চললেও এখন বাইক ছাড়া কোনও গাড়ি চলে না । আমাদের গাড়ি যেখানে আমাদের নামিয়ে দিল সেখান থেকে ঢালু পথে কিছুটা নেমে গেলে সেতুতে পৌঁছনো যায় । এই ঢালু পথটা বেশ ঢালু এবং চকচকে পাথর দিয়ে তৈরি । তাই চটি পরে এই রাস্তা দিয়ে না নামাই ভালো কারণ ফিরতি পথে ওঠার সময়ে অসুবিধে হতে পারে । তবে এই পথে না ফিরে অন্য একটা পথ দিয়েও ফেরা যায়, সেক্ষেত্রে একটা ঝর্ণার ওপর পাথরে পা দিয়ে ফিরতে হবে । দু'টোই কিছুটা কঠিন - সেইসঙ্গে থ্রিলিং-ও ।

বারবাটে হ্যাঙ্গিং ব্রীজ
আমাদের দলের কয়েকজন ব্রীজটা দেখতে গেলাম । হেঁটে পেরোতে বেশ ভালো লাগে - বিশেষ করে মাঝখানে পৌঁছে নিচের দিকে দেখতেও খুব ভালো লাগে । নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে একটা ঝর্ণা । বর্ষার পরে এই সময়ে পাহাড়ী ঝর্ণাগুলো বেশ পরিপুষ্ট থাকে তাই দেখতেও খুব ভালো লাগে । আমরা এখানে আবার অনেকটা সময় ব্যয় করলাম । ব্রীজটা পেরিয়ে একটা পায়ে চলা পথ আছে যেটা দিয়ে অন্য ফেরার পথটা ধরতে হয় । এখানে আমরা নিজেরাই আমাদের গাইড, যে পথে চলেছি আদৌ সেটা দিয়ে কোথাও পৌঁছনো যায় কিনা জানিনা কিন্তু ওই অজানার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলাই আনন্দের । ফেরার পথের একটাই সুবিধে যে কোনও চড়াই চড়তে হয় না, কিন্তু এক জায়গায় এসে ওই ঝর্ণাটা আবার পেরোতে হয় (এখানে একটা সিমেন্টের ব্রীজ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেটা এখনও অসম্পূর্ণ, তাই পায়ে হেঁটে ঝর্ণা পেরোনো ছাড়া উপায় নেই) । এখানে পাথরের ওপর পা দিয়ে ঝর্ণা পেরোলাম । কাজটা খুব সহজ নয় বিশেষ করে কোনও কারণে পা হড়কালে মৃত্যু না হলেও গুরুতর চোটের সম্ভাবনা । যাই হোক, কোনওরকম চোট না পেয়ে আমরা এপারে চলে এসে গাড়িতে উঠলাম ।

তাকদা চার্চ
দুপুর দু'টো বাজে - এখান থেকে বাংলোয় ফিরতে প্রায় একঘন্টা লাগবে তাই আমরা ফেরার পথে অর্কিড গার্ডেন দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করলাম । বাংলোয় ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে নেওয়া হল । বিকেলে কিছু করার নেই, তাই আমাদের বাংলোর চারপাশটা হেঁটে ঘোরার প্ল্যান করলাম । বাংলো থেকে নিচে নেমে এসে একটা রাস্তা ধরে কিছুটা উঠলে একটা চার্চ দেখতে পাওয়া যায় । এটা আগে আরেকটা বাংলোই ছিল, পরবর্তীকালে একে চার্চে পরিণত করা হয়েছে ।

তাকদার বাড়িঘর
চার্চ থেকে আমরা আরও এগোতে থাকলাম । রাস্তাটা প্রকৃতপক্ষে আমাদের বাংলোকে ঘিরে পাহাড়ের গা দিয়ে একটা পায়ে চলা পথ । এখানে আরও কিছু লোকজনের বাড়ি ইত্যাদি রয়েছে । এইভাবে চলতে চলতে একসময়ে গ্রামটা শেষ হয়ে পথটা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল । বিকেল শেষ হয়ে আসছে, এইসময়ে জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করা বিভিন্ন কারণেই নিরাপদ নয়, তাই জঙ্গলের মধ্যে কিছুদূর গিয়ে আমরা ফেরার পথ ধরলাম । তবে এইটুকুর মধ্যেই যতটা ট্রেকিং করলাম সেটা মনে রাখার মতো । ফেরার পথটা তাকদা মনাস্ট্রির পাশ দিয়ে । ঘরে ফিরে গিয়ে সেরকম কিছু করার নেই, তাই আমি আর বৈশাখী এখানে কিছুক্ষণ বসে রইলাম । সূর্য্যাস্ত হয়ে গেছে, পাহাড়ের ওপরে ক্রমশঃ আলো কমে আসছে - এই সময়টা এখানে বসে থাকতে খুব ভালো লাগে । এরপর একেবারে অন্ধকার হয়ে গেলে আমরা বাংলোয় ফিরে এলাম ।

আমাদের বেড়ানো এখানেই প্রায় শেষ কারণ পরেরদিন আমরা ফেরার ট্রেন ধরব । তাকদায় শেষ রাত্রিটা একইরকম সুন্দরভাবে কাটল ।

পরেরদিন আবার সকাল সকাল উঠলাম সূর্য্যোদয় দেখব বলে । এবারে আর বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছি না কারণ সেটা প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়ে যাবে । শুধু এ'টুকু বলছি আগেরদিনের থেকে আকাশ আরও বেশি পরিষ্কার থাকায় সূর্য্যোদয়টা আরও সুন্দর লাগল ।

পাইন ফরেস্টের রাস্তা
সাতটা নাগাদ আমরা তিনজন বেরোলাম হেঁটে পাইন ফরেস্ট দেখার জন্য । তাকদা জায়গাটা খুবই ছোট একটা গ্রাম - মিনিট দশেক হাঁটলেই গ্রাম শেষ হয়ে গিয়ে পাইনের জঙ্গল শুরু হয়ে যায় । আমরা যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, আগেরদিন সেই রাস্তা দিয়েই গাড়ি করে গেছি । হাঁটতে বেশ ভালো লাগছিল । রাস্তার দু'পাশে ঘন পাইনের জঙ্গল আর গাছগুলোর মধ্যে দিয়ে সূর্য্যের আলো পড়ছে - এই দৃশ্য সত্যিই খুব সুন্দর । আমরা হেঁটে হেঁটে অর্কিড গার্ডেন পর্যন্ত্য গিয়ে আবার ফিরে এলাম ।

তাকদায় আর কিছু ঘোরার নেই - আমরা ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ প্যাক করে নিলাম । পাহাড় থেকে নামার সময়ে সবসময়েই হাতে সময় নিয়ে বেরোতে হয়, বিশেষ করে দুপুরের পর থেকে সেভক রোডে ভীষণ জ্যাম হয় আর একবার সেই জ্যামে পড়লে ট্রেন ফেল হয়ে যেতে পারে । তাই আমরা বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম তাকদা থেকে । ঘন্টা দু'য়েক চলার পর লোহাপুল বলে একটা জায়গায় গাড়ি থামল লাঞ্চের জন্য । এখানে আমরা চিকেন মোমো, ভাত, এগ-কারী আর চিকেন দিয়ে লাঞ্চ সেরে নিলাম । খরচ পড়ল ১,০৫০/- টাকা ।

আবার গাড়ি এগিয়ে চলল । আমরা সেভকের জ্যাম না পেলেও রাস্তা বেশ খারাপ হওয়ায় নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছতে বিকেল সাড়ে চারটে বেজে গেল । স্টেশন থেকে আমরা ডিনারের মিক্সড চাউমিন আর চিলি চিকেন কিনে নিলাম । আমাদের ফেরার ট্রেন ছিল উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস যার স্টেশনে ঢোকার নির্ধারিত সময় বিকেল ৫:৪০ । ট্রেন ঢুকল প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট লেটে আর আমাদের শিয়ালদহে পৌঁছে দিল পরেরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটা । ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপঃ

১. শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঘন্টাতিনেকের গাড়ির দূরত্বে একটা তুলনামূলক কম বিখ্যাত জায়গা তাকদা । এখানকার উচ্চতা ৫,৫০০ ফুট - ঠান্ডা মাঝারি ধরনের ।
২. স্টেশন থেকে তাকদা যাওয়ার জন্য গাড়ি পাওয়া সহজ নয়, তাই আগে থেকে বুক করে রাখাই ভাল । সুমো বা ওই জাতীয় বড় গাড়ির তাকদা যাওয়ার ভাড়া ৩,০০০/- টাকা ।
৩. তাকদায় থাকার জায়গা হল 'ব্রিটিশ হেরিটেজ বাংলো' (এর অন্য নাম 'সাইনো হেরিটেজ গেস্ট হাউস') । এদের ওয়েবসাইট http://heritagebungalows.com/takdah-british-bungalow-west-bengal/ থেকে এদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় । কলকাতা থেকে এদের বুকিং করার ফোন নম্বর ঃ (033)25299689, 8902232559 ।
৪. তাকদার ব্রিটিশ বাংলো একটা পাহাড়ের ওপরে । এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই মনোরম ।
৫. ব্রিটিশ বাংলোয় সারাদিনের খাওয়াদাওয়ার জন্য মাথাপিছু প্রতিদিন ৬০০/- টাকা করে লাগে । এতে সকালে ব্রেকফাস্ট, দুপুরে লাঞ্চ, বিকেলে চা আর রাতের ডিনার পাওয়া যায় । এর বাইরে খাবার নিলে তার জন্য আলাদা চার্জ লাগে ।
৬. এখানকার খাবারের মান বেশ ভালো । এরা একেবারেই ঘরোয়া রান্না করে যার ফলে খেয়ে কখনও শরীর খারাপ করার সম্ভাবনা থাকে না ।
৭. বাংলোর ঠিক পিছনেই কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠলে তাকদা মনাস্ট্রি । এখান থেকে সূর্য্যোদয় বা সূর্য্যাস্তের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর । তবে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোনও ভিউ পাওয়া যায় না ।
৮. বাংলো থেকে পায়ে হাঁটা পথে মিনিটদশেক হাঁটলে পৌঁছনো যায় একটা চার্চে । এটা আগে একটা বাংলো ছিল -বর্তমানে চার্চে পরিণত করা হয়েছে ।
৯. বাংলোর পিছনে পায়ে হাঁটা পথ দিয়ে ইচ্ছে করলে ট্রেকিং করা যায় । কিছুদূর এগোলে পাহাড়ী পথে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়া যায়, তবে সঠিক জুতো না পরে এখানে যাওয়া ঠিক হবে না ।
১০. বাংলো থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে পাইন ফরেস্ট আছে । এখানে দেখা যায় নানারকম নাম-না-জানা পাহাড়ী ফুলের গাছ যা দেখতে খুব ভালো লাগে ।
১১. তাকদার লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর মধ্যে আছে 'অর্কিড গার্ডেন', 'রাংলি-রাংলিওট টি-গার্ডেন', 'তিস্তা ভ্যালি দূরবীন ভিউ পয়েন্ট', 'বারবাটে হ্যাঙ্গিং ব্রীজ' । এগুলোর কোনওটাই খুব বেশি দূরে নয়, তাই গাড়িতে হাফ-ডে ট্যুরেই ঘুরে আসা যায় । গাড়ি এরজন্য নেয় ২,০০০/- টাকা ।
১২. তাকদা থেকে সারাদিনের সাইট-সিয়িং এর জন্য কালিম্পং বা দার্জিলিঙ যাওয়া যেতে পারে । গাড়ি এরজন্য নেয় ৩,০০০/- টাকা ।
১৩. তাকদা থেকে কালিম্পং যাওয়ার পথে 'তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট', 'ছোটামাঙ্গয়া অরেঞ্জ গার্ডেন' দেখার মতো জায়গা । তাকদা থেকে কালিম্পং যেতে ঘন্টা দুয়েক লাগে ।
১৪. কালিম্পং শহরে একটা ক্যাকটাস গার্ডেন আছে যেটা দেখার মতো । এছাড়া কালিম্পং থেকে অনতিদূরে ডেলো পার্ক আছে যেখানে যাওয়া যেতে পারে ।

উপসংহারঃ

তাকদা
দার্জিলিঙ-কার্শিয়ং-কালিম্পং এর ভীড়ভাট্টা যাদের পছন্দ নয়, তাদের জন্য প্রায় একই দূরত্বে আরেকটা ঘোরার জায়গা - তাকদা । আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা - তাকদার সবকিছুই ভালো । ভালো থাকার জায়গা, ভালো খাওয়া, ভালো প্রাকৃতিক দৃশ্য, ভালো ঘোরা সবমিলিয়ে তাকদা অনবদ্য । এটা আসলে একটা ছোট গ্রাম, খুব বেশি লোকের বসতিও নেই । ট্যুরিস্টদের কেনাকাটা করার মতো সেরকম কোনও দোকান নেই আর তাই ট্যুরিস্টদের নিয়ে এখানকার মানুষের কোনও বাড়াবাড়িও নেই । আর এই বৈশিষ্ট্যই জায়গাটাকে আরও মনোরম করে তুলেছে । এখানে সূর্য্যোদয় আর সূর্য্যাস্ত দু'টোই ভীষণ সুন্দর হয় - যা খুব কম পাহাড়ী জায়গাতেই দেখা যায় । এখানে এসে যদি আর কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা নাও করা হয়, শুধুমাত্র দু'তিন দিন এখানে বসে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দিতেও দারুণ লাগবে । একটা ছোট্ট পরিসরে ততধিক ছোট্ট একটা গ্রাম - কিন্তু সৌন্দর্য্যের দিক থেকে বিশালাকার । প্রকৃতি এখানে নিজেকে মেলে ধরেছে স্বমহিমায় আর সেই জন্যই কৃত্রিমতার ছাপ খুব কম । তাই এইরকম জায়গা এবং পরিবেশ যাদের পছন্দ, তাকদায় একবার ঘুরে আসাটা তাদের জন্য একটা লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স - এটা বলা যেতেই পারে !

তাকদা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, June 5, 2016

শঙ্করপুর ভ্রমণ

০১৪ সালে তাজপুর ভ্রমণের পর অফিস থেকে আমরা এবারে গেলাম শঙ্করপুর । পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত এই জায়গাটা তাজপুরের মতোই, তবে তাজপুরের তুলনায় বেশি ফাঁকা । সপ্তাহান্তে কলকাতা থেকে একদিনের জন্য ঘুরতে যেতে হলে যে যে অপশনগুলো আছে, শঙ্করপুর তাদের মধ্যে অন্যতম ।

রামনগর স্টেশনে পুরো দল (ফোটোগ্রাফার বৈশাখী বাদে)
৪ঠা জুন, ২০১৬ শনিবার সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসে আমাদের যাত্রা শুরু । ট্রেন ছাড়ে সকাল ৬:৪০ এ আর রামনগর পৌঁছয় ৯:৪৪ এ । এবারে আমাদের দল তিনজন শিশুসহ মোট একুশ জনের - বলা বাহুল্য তিনজনের মধ্যে দু'জন আমাদের যমজ মেয়ে কথা-কলি । এছাড়া অন্যজন কঙ্কনাদির মেয়ে মিঙ্কা । বড়দের নাম আর লিখলাম না । এখানে উল্লেখ করা দরকার আমাদের ট্রিপটার সম্পূর্ণ খরচ আমাদের অফিস বহন করেছে - হাওড়া থেকে হাওড়া পর্যন্ত আমাদের একপয়সাও লাগেনি । ট্রেনে ব্রেকফাস্টের জন্য কুকিজারের চিকেন স্যান্ডউইচ কেনা হয়েছিল, ট্রেন ছাড়ার একটু পরে সেগুলো খেয়ে নেওয়া হল । ট্রেন মাত্র পাঁচমিনিট লেট করে আমাদের পৌঁছে দিল রামনগর স্টেশনে ।

রামনগর থেকে শঙ্করপুর যাওয়ার জন্য ভ্যান, অটো, ট্রেকার পাওয়া যায় আর এখানে এদের একটা রেটচার্ট টাঙানো আছে । কিন্তু আমাদের হোটেল থেকে আগেই দু'টো বড় ট্রেকার ভাড়া করে রেখেছিলাম, সেগুলো আমাদের শঙ্করপুর পৌঁছে দিল সওয়া দশটার একটু পরে ।

অশোকা হোটেলের সামনে সমুদ্র
আমাদের হোটেলের নাম 'অশোকা হোটেল' । এটা একেবারে বিচের ধারেই - ঘর থেকে সমুদ্র দেখা যায় । আমরা মোট আটটা নন-এসি ঘর নিয়েছিলাম আর ঘরভাড়া ৭৫০/- টাকা করে (ডিসকাউন্ট দিয়ে) । ঘরগুলো খুব বড় নয়, তবে আমাদের মেয়াদ মাত্র একরাত, তাই কোনও অসুবিধে হয়নি । ঘরে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম । তারপর এগারোটা নাগাদ গেলাম সমুদ্র দেখতে ।




শঙ্করপুরের বাঁধানো পাড়
শঙ্করপুরে একটা বড় জায়গা জুড়ে সমুদ্রের পাড় বাঁধানো । অশোকার সামনের পুরোটাই এরকম । এইরকম জায়গায় চান করা যায় না, তাই চান করার জন্য আমাদের আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে হল । বাঁধানো পাড় শেষ হওয়ার পর চান করার জায়গাটা খুবই সুন্দর । দুপুরের দিকে জোয়ার ছিল বলে চান করতে আরও আরাম । সঙ্গে বাচ্চা থাকায় অমৃতা আর আমি চান করলাম না, পাড়ে বসেই এনজয় করলাম । এছাড়া সমুদ্রের ধারে গেলে যা করতেই হয় - ডাব খেলাম ।

দুপুরে হোটেলে ফিরে এসে চান করে লাঞ্চ করতে গেলাম । অশোকার ডাইনিং হলটা বেশ বড় - একসঙ্গে ৩০ জন বসে খাওয়া যায় । দুপুরের মেনুতে ছিল ভাত, ডাল, আলুভাজা, পোস্ত, পারসে মাছ, ভেটকি মাছ, চাটনি, পাঁপড় ইত্যাদি । খাবারের কথা উল্লেখ করলাম কারণ এখানকার রান্না অদ্ভুত সুন্দর । প্রত্যেকটা আইটেমই খেতে অত্যন্ত ভালো হয়েছিল আর সেইজন্যই কিছুটা বেশি খাওয়া হয়ে গেল । খাওয়ার পরে দুপুরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম ।

সমুদ্রের ধারে কথা-কলির সঙ্গে আমরা
বিকেলে আবার সমুদ্রের ধারে । শঙ্করপুর তাজপুর মন্দারমণি - এই ্জায়গাগুলোয় সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই নেই, তাই হোটেলে থাকা অথবা সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসা এছাড়া আর কিছু করার নেই । শঙ্করপুরে সমুদ্রের ঢেউ ভালোই, আর বাঁধানো পাড়ে একটু নিচের দিকে গিয়ে বসলে জল এসে পায়ে আছড়ে পড়ে, তাই এখানে বসে থাকলে দিব্যি সময় কেটে যায় । সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার সময়ে হোটেল থেকে ইভনিং স্ন্যাক্স দিল - চা, ভেজ পকোড়া আর চিকেন পকোড়া । আমরা সমুদ্রের ধারে বসেই এগুলোর সদ্ব্যবহার করলাম । সাড়ে আটটার পরে আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম ।

ডিনারের মেনু ছিল রুটি, চিকেন কারি আর আইসক্রিম । খাওয়ার পরে ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম । আমাদের ঘরটা ছিল একেবারে সামনের দিকের ঘর, তাই সমুদ্রের হাওয়া খুবই দিচ্ছিল । গরমকাল হওয়া সত্ত্বেও ঘরের মধ্যে বেশ আরাম লাগছিল ।

শঙ্করপুরের সূর্য্যোদয় - সমুদ্রের ওপরে হচ্ছে না
পরেরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন সূর্য্যোদয় হয়ে গেছে । এখন জুনমাস, আর শঙ্করপুরে সমুদ্রের ওপর থেকে সূর্য্যোদয় হয় না । তবে সকালে সমুদ্রের ধারে ঘুরতে ভালোই লাগে । বেলা সাড়ে আটটা নাগাদ আমাদের ব্রেকফাস্ট দিয়ে দিল । লুচি আর আলুর তরকারি । আগেরদিনের লাঞ্চ থেকে শুরু করে এই ব্রেকফাস্ট পর্যন্ত্য পুরোটা খাওয়ার প্যাকেজের মধ্যে - মাথাপিছু খরচ ৬২৫/- টাকা । আমরা দুপুরের লাঞ্চটা এদের থেকে প্যাক করিয়ে নিলাম কারণ সেটা আমাদের ফেরার পথে লাগবে । মেনু হল ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন । এর দাম ১৫০/- টাকা করে । আমাদের ফেরার ট্রেন সেই তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস যেটা রামনগর থেকে ১০:৩৮ এ ছাড়ে ।

হোটেল থেকে চেক্-আউট করে বেরোলাম তখন সাড়ে ন'টা । আবার ট্রেকার আমাদের স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিল । নির্ধারিত সময়ে ট্রেন এল আর আমাদের নিয়ে ছেড়েও দিল । তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসের হাওড়া পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় দুপুর ১:৫০ আর ট্রেন লেট করল পঁচিশ মিনিট মতো । এখান থেকে ট্যাক্সি ধরে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে একদিনের জন্য কোথাও যেতে চাইলে শঙ্করপুর একটা ভালো অপশন । জায়গাটা মোটামুটি ফাঁকা, বিশ্রাম নেওয়ার পক্ষে খুব সুন্দর ।
২. হাওড়া থেকে ট্রেনে রামনগর পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি করে শঙ্করপুর যাওয়া যায় । এছাড়া সরাসরি গাড়ি নিয়েও এখানে যাওয়া যেতে পারে ।
৩. শঙ্করপুরে অল্পসংখ্যকই হোটেল আছে । 'অশোকা হোটেল' তাদের মধ্যে অন্যতম । এখানকার যোগাযোগের নম্বর - 03220-264275 । এছাড়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে এদের বুকিং করা যেতে পারে ।
৪. শঙ্করপুরের প্রায় সব হোটেলই সমুদ্রের ধারে । এখানে সমুদ্রের পাড় বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে বাঁধানো - কিছুটা জায়গা আছে যেখানে চান করা যায় ।
৫. শঙ্করপুরের সমুদ্রে ঢেঊ বেশ ভালো - চান করে ভালই লাগবে । সমুদ্রের ধারে অল্প কিছু দোকান আছে ।

উপসংহারঃ

শঙ্করপুর
কলকাতা থেকে সপ্তাহান্তে অর্থাৎ শনিবার গিয়ে রবিবার ফিরে আসার মতো জায়গা কমই আছে - শঙ্করপুর এদের মধ্যে অন্যতম । তাজপুর মন্দারমণি তালসারি বক্‌খালি উদয়পুরের মতো শঙ্করপুরেও সমুদ্র ছাড়া দেখার কিছুই নেই । তাই ঘুরতে যাওয়ার জন্য না গিয়ে বরং বলা যেতে পারে রিল্যাক্স করার জন্য শঙ্করপুর যাওয়া যেতে পারে । এখানে সমুদ্র বেশ সুন্দর - ভালো ঢেউ আছে । সমুদ্রে চান করা যেতে পারে আবার পাড়ে বসে সমুদ্রের দৃশ্যও উপভোগ করা যেতে পারে । আমাদের কোলাহলপূর্ণ দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে একটা শান্ত-সুন্দর পরিবেশে একটা দিন কাটানোর এই অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্যই শঙ্করপুর । এখানে হয়তো দেখার অনেক কিছু নেই, কিন্তু যা আছে তা সময় কাটানোর জন্য যথেষ্ট । সবমিলিয়ে খরচও খুব বেশি না । তাই যদি হাতে একদিনের ছুটিও না থাকে, শুধুমাত্র সপ্তাহান্তে একটা দিন কোথাও চলে যাওয়ার জন্য শঙ্করপুর অবশ্যই একটা দূর্দান্ত জায়গা !

শঙ্করপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

ফোটোগ্রাফার যখন ক্যামেরার সামনে
কৃতজ্ঞতা স্বীকার - শঙ্করপুরে অমৃতা বা আমি ক্যামেরা নিয়ে যাইনি কারণ আমাদের ছবি তোলার বিশেষ অবকাশ ছিল না । লেখার সঙ্গের সবক'টা ছবিই আমাদের অফিসের বৈশাখীর তোলা । এছাড়া উপরের লিঙ্কে আরও যা যা ছবি আছে, সেগুলোও ওরই তোলা । কথায় বলে প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনে একজন নারীর অবদান থাকে । শঙ্করপুরের প্রত্যেক সফল ছবির পিছনেও যে একজন নারীরই অবদান ছিল, এই ছবিগুলো তারই প্রমাণ !